বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৯ পূর্বাহ্ন

গণতন্ত্র এখন মৃত্যু উপত্যকায়: মার্কিন বিচারপতি কাগান

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক কয়েকটি রায় দেশটির গণতন্ত্র এখন মৃত্যু উপত্যকায় বলে মন্তব্য করেছেন বিচারপতি এলেনা কাগান। তার অভিযোগ, আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত ভোটাধিকার সুরক্ষা কমিয়েছে, নির্বাচনী এলাকার সীমানা দলীয় স্বার্থে পুনর্নির্ধারণের সুযোগ বাড়িয়েছে এবং নির্বাচনে অর্থের প্রভাব আরও বিস্তৃত করেছে।

ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় এসব কথা বলেন সাবেক এই বিচারপতি। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দুই সপ্তাহ আগে তাঁর এ মন্তব্য দেশটির নির্বাচনব্যবস্থা ও সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ককে সামনে এনেছে।

সুপ্রিম কোর্টের নয় বিচারপতির মধ্যে তিনজন উদারপন্থী হিসেবে পরিচিত। তাদের একজন কাগান। আদালতের ৬-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠ রক্ষণশীল বিচারপতিদের কয়েকটি সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব রায়ের বাস্তব প্রভাব সম্পর্কে আদালত যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি।

নির্বাচনী এলাকার সীমানা নিয়ে উদ্বেগ

কাগানের সমালোচনার অন্যতম বিষয় হলো ‘পার্টিজান জেরিম্যান্ডারিং’। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের রাজনৈতিক প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী এলাকার সীমানা এমনভাবে নির্ধারণ করে, যাতে নির্দিষ্ট দলের প্রার্থীরা সুবিধা পান।

কাগানের মতে, রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক- দুই দলই এ প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছে। এতে ভোটারদের সমান প্রতিনিধিত্বের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও চরম অবস্থায় পৌঁছাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বড় বড় অঙ্গরাজ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক ভোটার থাকা সত্ত্বেও নির্বাচনী এলাকার সীমানা এমনভাবে পাল্টানোর চেষ্টা হচ্ছে, যাতে পুরো অঙ্গরাজ্য কার্যত একটি দলের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাঁর ভাষায়, এ প্রবণতা গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

ভোটাধিকার আইনে আদালতের রায়

১৯৬৫ সালের ভোটাধিকার আইন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণভিত্তিক ভোটবৈষম্য প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইন। এ বছরের এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে আইনটির সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে বলে সমালোচনা করেন কাগান। রায়ের পর দক্ষিণাঞ্চলীয় কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনী এলাকার সীমানা নতুন করে নির্ধারণের উদ্যোগ দেখা যায়। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর ফলে যেসব এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে, সেসব এলাকার প্রতিনিধিত্ব কমে যেতে পারে।

টেক্সাসের রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন সরকার গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে নির্বাচনী মানচিত্র পুনর্নির্ধারণ করে। এর লক্ষ্য ছিল প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্রেটিকদের দখলে থাকা কিছু আসনে রিপাবলিকানদের জয়ের সুযোগ বাড়ানো। পরে ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বও রিপাবলিকানদের আসন লক্ষ্য করে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পরিবর্তন করে। কাগানের মতে, আদালতের সিদ্ধান্তগুলো এমন প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করছে, যা রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়িয়ে তুলছে।

নির্বাচনে অর্থের প্রভাব নিয়েও সমালোচনা

নির্বাচনী প্রচারে অর্থ ব্যয়ের ওপর বিধিনিষেধসংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের জুনের একটি রায়েরও সমালোচনা করেন কাগান। ওই রায়ে প্রার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার ব্যয়ের ওপর থাকা একটি সীমা বাতিল করা হয়। কাগানের আশঙ্কা, এতে ধনী দাতা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে প্রার্থীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ বাড়তে পারে। অর্থের বিনিময়ে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে আদালত যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তার মতে, রাজনীতিতে বিপুল অর্থের প্রবাহ সাধারণ মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা যদি অর্থশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, তাহলে সাধারণ ভোটারদের মতামতের গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আদালতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

তবে কাগান এমন ধারণা নাকচ করেছেন যে সুপ্রিম কোর্ট সব ক্ষেত্রেই ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে অবস্থান নেয়। তিনি উল্লেখ করেন, শুল্কনীতি, জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব এবং ডাকযোগে ভোটদানের মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালত ট্রাম্পের অগ্রাধিকারের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এরপরও কাগানের মতে, আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠের কিছু সিদ্ধান্ত মার্কিন গণতন্ত্রের কার্যকারিতা দুর্বল করেছে। তিনি স্মরণ করেন, বিচারপতি অ্যান্টোনিন স্কালিয়ার মৃত্যুর পর আদালতে আটজন বিচারপতি থাকার সময় পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন বেড়েছিল। তাঁর মতে, সে সময় আদালতের প্রতি জনআস্থাও ছিল তুলনামূলক বেশি।

নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ভোটাধিকার, নির্বাচনী এলাকার সীমানা ও প্রচার ব্যয়ের প্রশ্নগুলো এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কাগানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, এসব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত শুধু আইনি বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নয়; দেশটির রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপরও এর বড় প্রভাব পড়ছে। সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD