হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও বেড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ব্রেন্ট ক্রুডের প্রতি ব্যারেলের দাম ১.৫ শতাংশ বেড়ে ১১১.২৭ ডলারে দাঁড়ায়।
গত পাঁচ মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডাব্লিউটিআই) দামও ২ শতাংশ বেড়ে ১০০.৬০ ডলারে ওঠে। পরে দিনের এক পর্যায়ে ব্রেন্ট ক্রুড ও ডাব্লিউটিআইয়ের দাম কমে ১০৯.২৭ ও ৯৮.৪৬ ডলারে নেমে আসে। চলতি বছরের মে মাসে ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১১ ডলারের ওপরে উঠেছিল।
তবে জুনের শেষে ৭৩ ডলারে নেমে আসে। এপ্রিলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমতে শুরু করে। তবে জুলাই থেকে ওই অঞ্চলে আবারও উত্তেজনা বাড়তে থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করে। পারস্য উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কমে আসায় বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। তেলের দাম দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে। এর পাশাপাশি পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প-কারখানার উৎপাদন খরচেও চাপ তৈরি হতে পারে। তেল সরবরাহে পরবর্তী বড় ধরনের ধাক্কাটা আসতে পারে সৌদি আরব থেকে।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে চলমান সংঘাত এ সপ্তাহের তেল সরবরাহ পরিস্থিতির মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী তাদের হামলার পরিধি কেবল অবকাঠামোগত স্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে শাইবাহ তেলক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে। এতে ঝুঁকিটা এমন হয়েছে যে সৌদিকে হয়তো তাদের দেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু তেল উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে হতে পারে।
বিশ্ববাজারভিত্তিক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, তেলবাহী ট্যাংকারে ধারাবাহিক হামলায় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানি প্রায় যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। কিন্তু নতুন করে হামলার পর সরবরাহ আবারও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। গত দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে কেপলার জানায়, পারস্য উপসাগর থেকে দৈনিক গড়ে তেল সরবরাহ কমে ৮৫ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও দৈনিক সরবরাহের পরিমাণ ছিল দুই কোটি ব্যারেলের বেশি।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজির বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় তেলের দাম বাড়ছে। অনিশ্চয়তার কারণে বাজারে তেলের দামের সঙ্গে ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত মূল্য যুক্ত হচ্ছে। তেল পরিবহনে ট্যাংকারের ভাড়া রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকিও বেড়েছে। বিশ্লেষক ওয়ারেন প্যাটারসন ও ইওয়া মান্থের মতে, তেল সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলে যুদ্ধের কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত মূল্য ধীরে ধীরে কমে যেত। তবে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতির তেমন উন্নতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
তেলের পরিবহন ব্যয় কমাতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ট্যাংকার বিক্রির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ট্যাংকারগুলো ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নামে পরিচিত। এসব ট্যাংকার প্রচলিত পশ্চিমা শিপিং ও বীমাব্যবস্থার বাইরে থেকে তেল পরিবহন করে।
যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কিছু ট্যাংকার বিক্রির অনুমতি দিলে সেগুলো আবার বৈধ বাজারে ফিরতে পারে। এতে তেল পরিবহনের সক্ষমতা বাড়তে পারে এবং সরবরাহ ব্যয় কমতে পারে। তবে এসব ট্যাংকার যুক্ত হলে পরিবহন সক্ষমতা কতটা বাড়বে এবং কত দ্রুত তা তেলের দাম কমাতে সহায়তা করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে উল্লেখ করেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র : অয়েলপ্রাইস ডটকম