বুধবার মধ্যরাত। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু হয়েছে চিকিৎসাসেবায় আইসিইউ সাপোর্ট না পেয়ে। এর আগে রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে বহু সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরে মৃত্যুবরণ করেছেন। চট্টগ্রামজুড়ে চলছে এখন আইসিইউ সেবা না পাওয়া রোগীর স্বজনদের আহাজারী।
এমন এক অমানবিক পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে জ্বলে উঠেছে মানবিকতার ‘উজ্জ্বল প্রদীপ’। সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র রেজাউর রহমান। সাতকানিয়া উপজেলার চরতি ইউনিয়নের বাসিন্দা এই ছাত্র করোনাকালে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অবস্থান করছিলেন নিজ বাড়িতে। সেখানেই ১০ দিন আগে আক্রান্ত হন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে মঙ্গলবার চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর তাঁর শারীরিক অবস্থা আরো খারাপ হলে স্থানান্তর করা হয় আইসিইউতে।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা নেমে আসে ৬৫ শতাংশে। স্বাভাবিক সময়ে ৯৫ শতাংশ থাকার কথা।
অক্সিজেনের মাত্র কমতে থাকায় রোগীর অবস্থা অবনতি হতে থাকে। কিন্তু চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে হাই ফ্লু ন্যাসাল ক্যানোলা দিয়ে রোগীকে মিনিটে ২০-৬০ লিটার পরিমাণে অক্সিজেন দেওয়ার সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়ে চিকিৎসকেরা তাঁকে মাত্র ১২ লিটার অক্সিজেন দিতে থাকেন।
এমন পরিস্থিতিতে রোগীর অবস্থা ধারাবাহিকভাবে অবনতির দিকে যাওয়ায় ওই হাসপাতালের ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞ সার্জন মোরশেদ আলী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্ট্যাস্টাস দেন বৃহস্পতিবার দুপুরে। তিনি লিখেন, “বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রেজাউরের জীবন প্রদীপ নিভু নিভু। শেষ চেষ্টা হিসেবে রোগীকে হাই ফ্লু ন্যাসাল ক্যানুলার মাধ্যমে মিনিটে ৩০ লিটার অক্সিজেন সরবরাহ করা প্রয়োজন। কিন্তু জেনারেল হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন না থাকায় সিলিন্ডারের মাধ্যমে হাই ফ্লু ন্যাসাল ক্যানুলার মাধ্যমে প্রতি মিনিটে ৩০ লিটার অক্সিজেন চালালে আইসিইউতে থাকা অন্য ৯ জন রোগীর অবস্থা শঙ্কটাপণ্য হয়ে পড়বে। তাই রোগীকে বাঁচাতে এই মুহূর্তে ১০টি সিলিন্ডার খুবই প্রয়োজন। কারো কাছে অব্যবহৃত সিলিন্ডার থাকলে বা কিনে দিয়ে এগিয়ে আসতে পারেন।
ডা. মোরশেদ আলী স্ট্যাস্টাস দেওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই জেনারেল হাসপাতালে ১০টি সিলিন্ডার সরবরাহ করার জন্য এগিয়ে আসে #ActionTEAM_in_CoronaDays নামের একটি দল। এই দলটি করোনাকালে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে নানা ধরনের চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়েছে। এই দলটি প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয়ে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে ১০টি সিলিন্ডার কিনে পাঠিয়ে দেয় জেনারেল হাসপাতালে। এই দলটি নেপথ্যে থেকে করোনাকালে মানবিক কাজ করতে চায়। তাই পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি দলটির এডমিন।
নতুন অক্সিজেন সিলিন্ডার পেয়ে প্রাণ ফিরে হাসপাতালের ডাক্তারদের মনে। কারণ, হাই ফ্লু অক্সিজেন না হলে রোগী বাঁচানো কঠিন। আবার একজন রোগীকে বাঁচাতে গিয়ে অন্য ৯ জন রোগীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার সিদ্ধান্তও নেননি ডাক্তাররা।
সন্ধ্যায় ডা. মোরশেদ আলী বলেন, ‘১০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার পেয়ে মনে হচ্ছে নিজেই শ্বাস নিচ্ছি। এখন এই সিলিন্ডারগুলো রিফিল করে রোগীদের হাই ফ্লু অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম জেনালের হাসপাতালে কেন্দ্রীয়ভাবে অক্সিজেন রিজার্ভার না থাকার কারণে এই সমস্যা হচ্ছে। দ্রুততার সঙ্গে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন রির্জাভার স্থাপন হলে অনেক রোগীর জীবন হয়তো রক্ষা করা সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘রেজাউরের শরীরে সন্ধ্যায় অক্সিজেনের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। বলা যায়, এখন জীবন আশঙ্কামুক্ত।’
তিনি বলেন, ‘রেজাউরের চিকিৎসার জন্য অক্সিজেন দিয়ে কিছু দানবীর মানুষ চট্টগ্রামে এখনো মানবিকতার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছেন। তাঁরা এই অক্সিজেন রেজাউরকে দেননি, দিয়েছেন চট্টগ্রামে নিভু নিভু মানবিকতার প্রদীপে। যা পেয়ে এখনো মানবিকতার প্রদীপ জ্বলছে। তবে আরো প্রজ্জ্বলিত করার সুযোগ আছে। সেজন্য চট্টগ্রামের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।’
লাইট নিউজ