রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:০২ অপরাহ্ন

আজ থেকে বিএনপিকে নয়, ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করব

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬

বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘এত দিন বলতাম, আমরা সরকারকে সহযোগিতা করব; আজ থেকে ঘোষণা দিচ্ছি, ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করব। এই সরকার আমাদের সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ; বিরোধী দলের সহযোগিতা নেওয়ার মতো যোগ্যতা তাদের নেই।’

রোববার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির উদ্যোগে আয়োজিত ‘জুলাই সনদের ১ বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা বক্তব্য দেন।

জামায়াত আমির বলেন, ‘আমরা বিএনপি সরকারের পতন চাইনি, চেয়েছিলাম তাদের সফলতা। কারণ তাদের সফলতা মানে দেশের সফলতা। সম্প্রতি লোডশেডিংয়ে যখন জনজীবন অতিষ্ঠ, আমরা সংসদে নোটিস দিয়ে আলোচনা করে প্রস্তাব দিয়েছিলাম—এই সংকট নিরসনে আমরা ভূমিকা রাখতে চাই। আমাদেরও এ দেশের মানুষ ম্যান্ডেট দিয়ে এখানে পাঠিয়েছে। আমরা সংসদীয় কমিটি গঠনের কথা বলিনি, আমরা বলেছিলাম—আমাদের একটি টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিম আছে, সেই টিমকে সরকারের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হোক। কিন্তু তারা সাহস করে তা কবুল করেনি। কীভাবে করবে? এর আগে যেসব দুর্নীতি করা হয়েছে, তা তো ফাঁস হয়ে যাবে! এর মধ্য দিয়ে তারা প্রমাণ করেছে—তারা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বললেও প্রকৃতপক্ষে তাদের কাছে সবার আগে বাংলাদেশ নয়; সবার আগে তারা নিজে, তাদের পরিবার, সন্তান, ভাগ্নে, ভাতিজা, শ্বশুর ও স্ত্রী।’

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্ট দুপুরের আগ পর্যন্ত বিএনপি আমাদের মতোই একটি মজলুম দল ছিল। কিন্তু এর পর থেকেই বিএনপি রাতারাতি তাদের অতীত ভুলে গেছে। তারা জুলাই সনদের কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করলেও গণভোটের ব্যাপারে কোনো ভিন্নমত প্রকাশ করেনি। তবে একটি জায়গায় ভিন্নতা ছিল—আমরা চেয়েছিলাম গণভোটটি আগেই হোক। তারা তা চায়নি; তারা জোর করে একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট করার দাবি জানায়। সে অনুযায়ী একই দিনে গণভোট ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশন থেকে জানানো হয় যে, একই দিনে দুটি শপথ অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু আমরা দুটিরই শপথ নিলেও বিএনপি নিয়েছে মাত্র একটির।’

তিনি আরও বলেন, ‘অতীতে ঐতিহ্য ছিল—একই দিনে একদিকে বিরোধী দল দাঁড়াবে, অন্যদিকে সরকারি দল দাঁড়াবে এবং শপথ অনুষ্ঠান একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু তারা এবার চালাকি করে আলাদা শপথের কথা বলল। অর্থাৎ, গোড়া থেকেই জাতির বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেল। এরপর তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে আর শপথ নেননি। এভাবে তারা জাতির সঙ্গে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে, যার ধারা এখনো অব্যাহত আছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন তারা কায়দা করে ইনিয়ে-বিনিয়ে বিভিন্ন পোষা লোকের মাধ্যমে প্রশ্ন উত্থাপন করছেন—এত আগে কেন বিরোধী দল আন্দোলনে? আমরা তো আন্দোলন চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম, জাতি ভোট দিয়ে একটি সরকার গঠন করেছে পাঁচ বছর চালানোর জন্য এবং আরেকটি ভোট দিয়েছে রাষ্ট্র মেরামতের জন্য। এ দুটি ভোটের মূল্যায়ন যদি বিএনপি করত, তাহলে আমাদের এক সেকেন্ডের জন্যও সংসদের বাইরে আপাতত আন্দোলন করার প্রয়োজন হতো না। তারাই তো আমাদের আন্দোলনের পথে ঠেলে দিয়েছে। তারা ইতোমধ্যে বহু জায়গায় তাদের ওয়াদা লঙ্ঘন করেছে।’

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “প্রতিটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে তারা হাত দিয়েছে। ছাত্ররা মেধার অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নেমে এসেছিল। কিন্তু একটির পর একটি প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পর এখন পিএসসির (সরকারি কর্ম কমিশন) ওপর হাত পড়েছে। একজন মন্ত্রী পিএসসি সদস্যদের ডেকে নিয়ে চায়ের টেবিলে পদত্যাগের কথা বলে বলছেন—‘বোঝেনই তো, এখন তো রাজনৈতিক সরকার; সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী চলতে হবে।’ পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কোনো মন্ত্রীর এটি পারিবারিক ব্যবসা নয় এবং পিএসসির কোনো মেম্বারকে এভাবে কথা বলার কোনো অধিকার মন্ত্রীর নেই। তার মানে, সরকারি চাকরির আসল জায়গাটি এখন তারা পুরোপুরি দলীয় ক্যাডারদের দিয়ে পূর্ণ করতে চায়। এ জন্য মাঝেমধ্যে তারা বলেও ফেলছেন—‘এই জিনিস বা ওই জিনিস শুধুমাত্র বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের জন্য; ওই এলাকায় কোনো কাজ করা যাবে না, যে এলাকার মানুষ আমাদের ভোট দেয়নি বা দেবে না।’ এখানে চিফ হুইপের কথা বলেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ এমপি। এর আগে তো বর্তমান প্রেসিডেন্ট রংপুরে গিয়ে একই কথা বলে এসেছেন। আবু সাঈদের এলাকায় গিয়ে বলে আসলেন—‘ভোট দেবেন জামায়াতকে, জাতীয় পার্টিকে; আর উন্নয়ন চাইবেন বিএনপির কাছে?’ এটা কি বিএনপির বাবার তহবিলের টাকা দিয়ে উন্নয়ন হবে? না, তা হবে না।”

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্রের রাজকোষে আজ জন্ম নেওয়া শিশু থেকে শুরু করে বয়োজ্যেষ্ঠ—সব পেশা ও শ্রেণির মানুষের অবদান আছে। কেউ সরাসরি, কেউ পরোক্ষভাবে ট্যাক্স দেয়। গরিবের টাকা আলাদা করে রাখা হয় না, সবই এক জায়গায় জমা হয়। সুতরাং এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া শুধু অশালীনতা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় অপরাধ। অথচ অনেকে অবলীলায় এই অপরাধ করে চলেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের আসনে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, অথচ বিরোধী দলের একজন এমপিকেও তা দেওয়া হয়নি। এই বৈষম্যের জন্যই কি এতগুলো তাজা প্রাণ গেল? এটার জন্যই কি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল? চব্বিশ ছিল আমূল পরিবর্তনের জন্য। ওই বস্তাপচা রাজনীতির কবর রচনা করে নতুন রাজনীতির সূচনা হবে—জনগণ সেটাই আশা করেছিল। কিন্তু দেশটাকে আবার সেই পুরোনো জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শেষ পর্যন্ত মহিষের ওপরও ট্যাক্স বসানো হচ্ছে; মহিষের ঘাস খাওয়ার জন্যও চাঁদা না দিলে তাকে মেরে ফেলা হচ্ছে। কোথায় গিয়ে নেমেছে এরা!’

জামায়াত আমির বলেন, ‘তারা বলছে, বিরোধী দল সরকারকে সহযোগিতা না করে এত আগেই আন্দোলনের ডাক দিয়েছে, নানা কথা বলছে। কিছু সুশীল ও বুদ্ধিজীবীও একই কথা বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু গত সাত মাসের মধ্যে রাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে জবাই করা হয়েছে। আগের স্বৈরাচার যে পথে হেঁটেছিল, বর্তমান সরকারও হুবহু সেই পথেই হাঁটছে। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দল কি আঙুল চুষে বসে থাকবে? না। শত ইঞ্জিনিয়ারিং ও কারচুপির পর জনগণ আমাদের যে কয়টি আসন দিয়েছে, সেই আসনের ৮৯ জন এমপি সারা দেশের ১৮ কোটি মানুষের পাহারাদার হিসেবে কাজ করবে, ইনশাআল্লাহ।’

তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা কথা দিচ্ছি—বিএনপি বদলে গেলেও আমরা আমাদের দেওয়া কথা পরিবর্তন করব না। জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় ইনশাআল্লাহ আমরা আদায় করেই ছাড়ব। ইনিয়ে-বিনিয়ে আমাদের বহু প্রলোভন দেখানো হয়েছে; আমরা সেগুলোর দিকে ফিরেও তাকাইনি, ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি। কেউ তার ইচ্ছামতো জাতির সঙ্গে প্রতারণা করলেও বিরোধী দল ইনশাআল্লাহ হিমালয় পর্বতের মতো অটল থেকে নিজ লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে।’

বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো সিন্ডিকেটের হাতে প্রিয় বাংলাদেশকে সঁপে দেব না। সেই দিন শেষ! যুবসমাজ জেগে উঠেছে; পূর্ণ মুক্তি না আসা পর্যন্ত তারা শান্ত হবে না। আর আমরা যুবকদের পাশে থেকে তাদের চেয়েও শক্তিশালী শক্তি হয়ে কাজ করে যাব, ইনশাআল্লাহ।’

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD