ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির আকাশচুম্বী দাম এবং সরকারি পরিষেবার অবনতির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন কয়েক হাজার মানুষ। শনিবার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য, শ্রমিক এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকেরা অংশ নেন। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, উচ্চ মজুরি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো এবং সরকারি পরিষেবার মানোন্নয়নের দাবিতে তারা একত্রিত হন। ক্রমবর্ধমান সামাজিক অসন্তোষের মধ্যে দেশজুড়ে এসব বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
প্যারিসে কয়েক ’শ বিক্ষোভকারী, যাদের অধিকাংশই মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গার দু নরড রেলস্টেশনের কাছে জড়ো হন এবং সড়কে অবরোধ তৈরি করেন। পুলিশ নিরাপত্তাবেষ্টনী গড়ে তোলে, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণকারী সদস্য মোতায়েন করে এবং প্লাস দ্য লা রিপাবলিকসহ গুরুত্বপূর্ণ জমায়েতস্থলের আশপাশে কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেয়।
বিক্ষোভকারীদের একাংশ একটি স্মৃতিস্তম্ভে উঠে পড়ে এবং পুলিশের দিকে জ্বলন্ত ফ্লেয়ার ছুড়ে মারলে সংঘর্ষ শুরু হয় বলে জানা গেছে। জবাবে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ। ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মার্সেইয়েও মুখোশধারী বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে একই ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল নাগাদ প্যারিসে অন্তত ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের দাবি, নিরাপত্তা তল্লাশির সময় অস্ত্র বা নিষিদ্ধ সুরক্ষাসামগ্রী রাখার অভিযোগে প্রাথমিকভাবে এসব গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দেশজুড়ে এই বিক্ষোভ অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি শিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে মানুষের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের প্রতিফলন। ইউনিয়ন সাঁদিকাল লিসেয়েনসহ বিভিন্ন শিক্ষার্থী সংগঠন কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীপূর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে আন্দোলন চালিয়ে আসছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ক্রমেই মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এতে ট্রেড ইউনিয়ন এবং ২০১৮ সালে ফ্রান্সজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন পুনরুজ্জীবিত করতে আগ্রহী বিভিন্ন গোষ্ঠীর সমর্থন যুক্ত হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানান। একই সঙ্গে তিনি বিক্ষোভকারীদের মানুষ ও সম্পত্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এই অস্থিরতাকে কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি মূলত শহুরে সহিংসতা। তিনি বামপন্থী রাজনৈতিক দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজ এবং দলটির নেতা জঁ-লুক মেলঁশোঁর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগানোর অভিযোগও করেন।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান এবং শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ নিরসনে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন। ভাঙচুরের শিকার কয়েকটি বিদ্যালয় পরিদর্শনের পর তিনি এ আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, অতি ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি দলের নেতা জর্দান বারদেলা বিক্ষোভের পরিস্থিতি এবং মেলঁশোঁর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা সংকটের মুখে ফরাসি সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে এই বিক্ষোভ। সরকার আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানালেও বিক্ষোভকারীরা পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় কমানো, শিক্ষা খাতে অর্থায়ন বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবার মান উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি