সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৩ পূর্বাহ্ন
আল জাজিরার বিশ্লেষণ

ইরান ইস্যুতে ব্রিকসের নীরবতা, ঐক্যের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

হযোগিতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর নানা প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এবারের ব্রিকস সম্মেলন। তবে ঘোষণাপত্রে ইরানের যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অনুপস্থিত।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাত ব্রিকসের ১১টি সদস্য ও ১০টি সহযোগী দেশের অধিকাংশকেই প্রভাবিত করলেও, জোটটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত ঘোষণাপত্রে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কোনো কথা বলা হয়নি। এমনকি এই সংঘাতে—বস্তুনিষ্ঠ বিচারে—আক্রমণকারী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত যুক্তরাষ্ট্রকেও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।

ঘোষণাপত্রের ভাষা এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে সব সদস্য দেশই অভিন্ন কূটনৈতিক অবস্থানের এক ছাতার নিচে থাকতে পারে। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পশ্চিমা-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি বিদ্যমান যৌথ অসন্তোষকে সুসংহত ভূ-রাজনৈতিক পদক্ষেপে রূপান্তর করা ব্রিকসের জন্য কতটা কঠিন।

এই অবস্থান ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকে সামনে এনেছে। মে মাসে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও ইরান যুদ্ধ নিয়ে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে নিন্দা জানাতে চাইলেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের হামলা ও নিজেদের নিরাপত্তা-উদ্বেগ উপেক্ষা করে এমন ভাষার বিরোধিতা করে।

ব্রিকস সম্প্রসারণে জোটটির আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়লেও সদস্যদের পারস্পরিক আঞ্চলিক বিরোধও সংগঠনের ভেতরে প্রবেশ করেছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত একই জোটের সদস্য হলেও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কৌশলগত স্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরবিরোধী। ফলে সরাসরি কোনো ভূরাজনৈতিক সংঘাতে একক অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলায় ভিন্ন স্বার্থ

ব্রিকস পশ্চিমা-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প শক্তি হিসেবে গড়ে উঠলেও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে সদস্যদের অবস্থান এক নয়। ভারতের কাছে ব্রিকস মূলত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার একটি প্ল্যাটফর্ম; এটি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী সামরিক জোট নয়। একইভাবে চীন ও রাশিয়া ব্রিকসকে পশ্চিমা চাপ মোকাবিলা ও বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা শক্তিশালী করার মাধ্যম হিসেবে দেখলেও সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি নিতে চায় না।

ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়াও ব্রিকসকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখে। তারা সংগঠনটিকে চীন বা রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক কৌশলের হাতিয়ার বানাতে আগ্রহী নয়।

বহুমেরুতার সীমাবদ্ধতা

ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য; আবার এই বৈচিত্র্যই তার দুর্বলতা। সদস্য বাড়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে ভিন্ন ভিন্ন জাতীয় স্বার্থ। ফলে ব্রিকস একটি শক্তিশালী দর-কষাকষির জোট হিসেবে এগোতে পারলেও এখনো একটি সুসংহত ভূরাজনৈতিক জোটে পরিণত হওয়া কঠিন।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার, উন্নয়ন অর্থায়ন, দক্ষিণ-দক্ষিণ বাণিজ্য, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন এবং পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর মতো বিষয়ে সদস্যদের ঐকমত্য তৈরি করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু কোনো বাস্তব ভূরাজনৈতিক সংঘাতে পক্ষ নেওয়ার প্রশ্নে মতৈক্য কঠিন হয়ে পড়ে। ইরান যুদ্ধ সেই বাস্তবতাই স্পষ্ট করেছে।

তবে এর অর্থ ব্রিকস অকার্যকর নয়। বরং সরাসরি সংঘাতের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বদলে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করাই ব্রিকসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের প্রধান উৎস হতে পারে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, বিকল্প উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, ডলারের বাইরে লেনদেন সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর কূটনৈতিক বিকল্প বাড়ানোর মাধ্যমে ব্রিকস ধীরে ধীরে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ, ভূরাজনৈতিক সংঘাতে ব্রিকসের সীমাবদ্ধতাই হয়তো তার শক্তি—সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামো বদলানোর সুযোগ তৈরি করছে।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD