জন্ম থেকেই শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী আল আমিন ভূঁইয়া (৩৩)। পায়ে জোর পান না।
চলাফেরা করতে হয় দুই হাতের সহায়তা নিয়ে। অভাবের সংসার। তাইতো অল্প বয়সেই তাঁকে নামানো হয়েছিল ভিক্ষাবৃত্তিতে। কিন্তু ভিক্ষা করা তাঁর পছন্দের নয়।
স্বপ্ন দেখতেন ব্যবসা করে স্বাবলম্বী হওয়ার। কিন্তু স্বপ্নপূরণে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পুঁজি। এ কারণে ছিলেন হতাশ। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে এগিয়ে চলা সেই আল আমিনের মুখে হাসি ফোটাতে এগিয়ে এসেছেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া।
গতকাল বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এসে নিজের স্বপ্ন ও অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন আল আমিন। তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন জেলা প্রশাসক। পরে তিনি প্রতিবন্ধী আল আমিনকে ব্যবসার জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। পাশাপাশি ব্যবসা ভালো করলে ভবিষ্যতেও তাঁর পাশে থাকার আশ্বাস দেন। স্বপ্নপূরণের আশ্বাসে দারুণ খুশি আল আমিন।
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান জেলা প্রশাসক এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে।
শুধু আল আমিন ভূঁইয়া নন, ওষুধ কেনার টাকা নেই, আর্থিক সমস্যা, জমি বেদখল, এলাকার উন্নয়ন ইত্যাদি সমস্যা নিয়ে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ জেলা প্রশাসকের কাছে আসেন। এক এক করে তিনি সবার কথা অত্যন্ত ধৈর্য ধরে শুনে তাৎক্ষণিক সমাধান দেন। দুশ্চিন্তা নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে এলেও ফেরার সময় কিন্তু প্রায় সবাই ছিলেন হাসিমুখে।
গাজীপুর মহানগরীর দীঘিরচালা এলাকা থেকে পঙ্গু বাবার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা চাইতে আসেন পোশাক শ্রমিক সানিয়া আক্তার। তিনি জেলা প্রশাসককে জানান, তাঁর বাবা মজিদ মিয়া ছিলেন লেগুনাচালক। ছয় বছর আগে দুর্ঘটনায় পা ভেঙে পঙ্গু অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন। মা মারা গেছেন ১১ বছর আগে। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছোট বোনের পড়ালেখা এবং বাবার চিকিৎসার জন্য তাঁকে চাকরি করতে হচ্ছে। যে টাকা বেতন পান ঘরভাড়া, সংসার খরচ, বোনের লেখাপড়ার খরচ দিতেই তা শেষ হয়ে যায়। অর্থের অভাবে বাবার চিকিৎসা বন্ধ। সব শুনে জেলা প্রশাসক তাঁকে বাবার চিকিৎসার জন্য নগদ টাকা এবং ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।
টাকার অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেছে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত টঙ্গীর অসহায় বৃদ্ধা সামসুন্নাহারের। তাঁকে নগদ অর্থ সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক।
গাজীপুরের ধীরাশ্রম থেকে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে এসেছেন বিধবা হালিমা আক্তার। জেলা প্রশাসকের কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। জানান, চার মাস আগে স্বামী মারা গেছেন। ছেলে না থাকায় ভাশুরসহ অন্যরা স্বামীর সম্পদ হাতিয়ে নিতে চাইছে। ঘরের সব জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি থেকে তাঁকে মেয়েসহ বের করে দিয়েছে। ১৩ বছরের কিশোরী মেয়েকে নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও বিচার পাচ্ছেন না। সবকিছু শুনে সদর সার্কেলের এসি ল্যান্ডকে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের দায়িত্ব দেন জেলা প্রশাসক।
এভাবে অধিগ্রহণ করা জমির বিল পেতে সমস্যা, মাতৃকালীন ভাতা, দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ক্ষতিপূরণ, এলাকার রাস্তার সমস্যা, অফিস স্থাপন, চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা, অগ্নিকাণ্ডে বাড়ি পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত, বাসস্থানের অভাব, কারখানার বকেয়া বেতনের টাকা আদায়ের মতো নানা সমস্যা নিয়ে আসা অসহায় মানুষদের সমস্যার সমাধান দেন জেলা প্রশাসক।
তাঁর এমন সব মানবিক কর্মকাণ্ড নিয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে প্রতি বুধবার গণশুনানি অর্থাৎ এলাকার সব ধরনের মানুষের কথা শোনা হয়। নানা অভাব-অভিযোগ আর সমস্যা নিয়ে আসেন তাঁরা। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বয়স্ক এবং অসহায়। সন্তান থাকলেও খোঁজ নেয় না। আবার অনেকের আপন বলতে কেউ নেই। নেই সমার্থ্যও। আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব, সেগুলো সমাধান করে দিই। বেশির ভাগ সমস্যাই থাকে জমিজমা, অর্থিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত। সরকারের নানা কার্যক্রম আছে। জটিল রোগের জন্য সমাজসেবা বিভাগ, গর্ভবতী মায়ের পুষ্টিকর খাবারের জন্য মহিলা ও শিশু বিভাগ ছাড়াও সরকারের প্রতিবন্ধী কল্যাণ ট্রাস্ট, বিআরটিএ, জেলা ত্রাণ বিভাগ থেকে অসহায় মানুষকে সাহায্যের সুযোগ রয়েছে। সরকারের এসব বিভাগ থেকে অসহায় মানুষকে সহায়তা পেতে সাহায্য করে যাচ্ছি।’