ডেস্ক রিপোর্ট : কখনো মন্দেরও কিছু ভালো দিক থাকে। এই যে করোনার ফলে মানুষ লকডাউনের কবলে পড়েছিল, তাতে অনেকেরই মিলে গিয়েছিল অনাকাঙ্ক্ষিত অবসর। কেউ কেউ সে সময়টাকে অবহেলায় না কাটিয়ে করেছেন নানা সৃজনশীল কাজ। রান্না আর সাজ শেখা ছিল সব কাজের ওপরের দিকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যবেক্ষণে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে
লকডাউনের অবসরে কেউ ছবি এঁকেছেন, তো কেউ বাগান করেছেন। অনেকে আবার পুরনো জামার কাটছাঁটে বদল ঘটিয়ে তাকে নতুন করেছেন। অনলাইনেও নানা সৃজনশীল কাজের কোর্স করেছেন অনেকে, কেউ আবার যোগব্যায়ামসহ নানারকম শরীরচর্চায় সময় পার করেছেন। দেখা গেছে ইউটিউব দেখে রান্না করা ও মেকআপ টিউটরিয়াল দেখে সাজের নানা দিক শিখে নেওয়ার ঝোঁকই ছিল বেশি। এক্ষেত্রে এমনকি ঢালি-বলি-হলিউডের তারকারাও বাদ যাননি।
আসলে কী হয়েছিল!
লকডাউনের ফলে বন্ধ ছিল সব কিছু। গত কয়েক বছরে মানুষের মধ্যে রেস্তোরাঁয় খেতে যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল বেশ খানিকটা। সব রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় দাঁড়ি পড়েছিল সে প্রবণতায়। এদিকে বন্দি থাকতে গিয়ে অনেকেই পড়েছিলেন একঘেয়েমিতে। হাতেও ছিল সময়। তাই যেটা খেতে মন চাইছে তা বানাতে শুরু করলেন ঘরেই। আপলোড দিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সাড়া মিলল অভাবিত। এ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রীতিমতো রান্নাই শিখে ফেললেন অনেকে। শুধু মেয়েরা সে দলে ছিল ভাবলে ভুল হবে। অনেক ছেলেও এই ধারায় শামিল করেছেন নিজেকে।
আবার একই কারণে সৌন্দর্য সেবাদান প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল বন্ধ। সাজের কথা বাদই থাক, নিতান্ত প্রয়োজনীয় সৌন্দর্য সেবা যেমন আইব্রো থ্রেডিং কিংবা নিয়মমাফিক ফেসিয়াল করতে যাওয়ার উপায়ও ছিল না। তাই তাঁরা দ্বারস্থ হলেন ইউটিউবেরই। শিখে নিলেন নিজেই এসব কাজ করার পদ্ধতি। ছেলেরাও নিজের চুল নিজে কেটেছেন এ সময়ে কিংবা সাহায্য নিয়েছেন বাড়িরই অন্য কোনো সদস্যের।
রান্না শিখি, রান্না করি
অভিনেত্রী মেহজাবিনকে এই সময়ে দেখা গেছে সবচেয়ে সপ্রতিভ। এমনিতে তো করেছেনই, এ ছাড়া বিভিন্ন উপলক্ষ কেন্দ্র করে নানারকম রান্না তিনি করেছেন। সেগুলো দিয়েছেন ইউটিউবে। শবে বরাতে হালুয়া, লাড্ডু তো ঈদে চিকেন রোস্ট, বিরিয়ানি। জানালেন, রান্নার শখ এমনিতেই ছিল। তার ওপর সময় পেয়ে শখের পোয়া বারো। সামাজিক মাধ্যমে দেওয়ার ফলে অনেকে তা দেখে শিখে রেঁধেছেন।
অনেকেই এই সময়ে নিজেরা রান্নার ভিডিও ব্লগ কিংবা ইউটিউব চ্যানেল খুলেছেন। শাহেনূর ইসলাম তানিয়া তাঁদেরই একজন। নানা পদ রেঁধে তিনি ইউটিউবে আপলোড করেন। এরই মধ্যে তাঁর চ্যানেলে ফলোয়ার সংখ্যাও অনেক। কথা হয় রন্ধনবিদ নাজিয়া ফারহানার সঙ্গে। বলেন, ‘এটা আসলেই খুব ভালো একটা দিক যে, অনেকে অনেক পদ রান্না করছেন। যিনি হয়তো জীবনে কোনো দিন খুন্তিও হাতে নেননি তিনি বিরিয়ানি, জিলাপির মতো পদ রান্না করছেন। হয়তো এই সময়টা পার হয়ে গেলে, আবার পুরোদস্তুর জীবনযাত্রা শুরু হলে মানুষের সময় কমে যাবে। রেস্তোরাঁর ওপরই ভরসা করতে হবে। তবে এই যে এখন রান্নাটা শিখছেন সেই শিক্ষা কিন্তু থেকেই যাবে। এটা অনেক বড় পাওনা।’
সাজি মনের আনন্দে
অভিনেত্রী সাফা কবিরের কথা বলা যায়। কয়েক দিনের ব্যবধানে ইনস্টাগ্রামে দেখা মিলল তার হেয়ার স্টাইলের কয়েকটি ছবি। তখন কিন্তু পার্লারগুলো এক্কেবারে বন্ধ। তো আর কী! সাফা নিজেই নানা হেয়ার স্টাইল করলেন আর দিলেন সামাজিক মাধ্যমে। তাতে আমজনতার অনুপ্রেরণার পালে লাগল হাওয়া। আর কে না জানে সাজলে মেয়েদের মন ভালো হয়।
এ তো গেল এক দিক। অন্যদিকে মেকআপ শেখার ঝোঁকও ছিল লক্ষণীয়। বিউটি ব্লগার ও মেকআপ আর্টিস্ট সেগুফতা আজমী নিজেও সেজেছেন, সাজিয়েছেন অন্যদেরও। জানালেন, এই সময়ে বাড়িতে বিয়ের চল ফিরেছে। করোনা আতঙ্কে অনেকেই পার্লারে না গিয়ে সেজেছেন বাড়িতেই। স্বতন্ত্র মেকআপ আর্টিস্টদের কদর এখন বিশেষভাবে বেড়েছে। সেগুফতা জানান, তিনি নিজেই এখন সপ্তাহে তিন-চারজন কনে সাজান। এতে কাজের চর্চা যেমন থাকে, আয়ও হয়।
শোভন মেকওভারের রূপ বিশেষজ্ঞ শোভন সাহা বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো দিক হলো, সাজের প্রতি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে। করোনার আগেও ক্লায়েন্টদের বেশির ভাগকেই আমরা যা পরামর্শ দিতাম তা মেনেই হেয়ার স্টাইল বা মেকআপ নিতেন। এখন আর তা হচ্ছে না। নিজেরা সাজছেন বাড়িতে কিংবা পার্লারে এলে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনি কী চান। এতে আমাদের কাজের মানও বাড়ছে বৈকি! সাজের বেলায় নজর কাড়ছে চোখ। মাস্কে মুখ বন্ধ থাকায় ঠোঁটের গুরুত্ব হালকা হয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিজের প্রতি যত্নবান হওয়া। এর চেয়ে ভালো কিছু তো হতে পারে না।
সূত্র : কালের কণ্ঠ