রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৬ পূর্বাহ্ন

কেপ ভার্দেতে কেমন চলছে মুসলিমদের জীবনযাত্রা?

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলরাশির মাঝে অবস্থিত ১০টি দ্বীপের দেশ কেপ ভার্দে। আগ্নেয়গিরির পর্বত আর মনোরম সমুদ্র সৈকতের এই দেশটিতে মূলত খ্রিস্টধর্মের প্রভাব থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে এক শান্তিময় ও ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনপদের বিকাশ ঘটছে। ২০২১ সালের জাতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৫ লক্ষ জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৫,০০০ জন (প্রায় ১ শতাংশ) মুসলিম বসবাস করেন, যাদের অধিকাংশেরই শিকড় প্রোথিত পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল, গিনি-বিসাউ এবং মালি থেকে আসা অভিবাসীদের মাঝে।

কেপ ভার্দেতে ইসলামের আগমন যেভাবে

কেপ ভার্দেতে ইসলামের পদচিহ্ন পড়েছিল সেই ১৫শ শতাব্দীতে, যখন ১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা এই দ্বীপপুঞ্জকে দাস ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলে। সেই সময় পশ্চিম আফ্রিকার ওলোফ, মান্ডিঙ্কা এবং ফুলানি গোষ্ঠীভুক্ত অনেক মুসলিমকে দাস হিসেবে এখানে আনা হয়েছিল। তবে পর্তুগিজ ক্যাথলিক শাসকরা ইসলাম চর্চাকে কঠোরভাবে দমন করত। মুসলিমদের জোরপূর্বক বাপ্তিস্ম দেওয়া হতো এবং কোরআন পাঠ বা ধর্মীয় আচার পালনের অপরাধে নির্বাসন বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল।

দীর্ঘ অন্ধকার কাটিয়ে ১৯৭৫ সালে পর্তুগাল থেকে স্বাধীনতা লাভের পর কেপ ভার্দে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। ১৯৯০-এর দশকে প্রথম সরকারিভাবে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি মেলে এবং ২০১৪ সালের এক আইনের মাধ্যমে মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনগুলো আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা লাভের অধিকার পায়।

ভৌগোলিক বিন্যাস ও জীবিকা

কেপ ভার্দেতে মুসলিমদের কোনো স্থায়ী গ্রামীণ বসতি নেই; তারা মূলত শহুরে জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত। অধিকাংশ মুসলিম রাজধানী প্রাইয়া (সান্তিয়াগো দ্বীপ) এবং বন্দরনগরী মিন্ডেলো (সাও ভিসেন্টে দ্বীপ) এলাকায় ঘনীভূত। এছাড়াও পর্যটন দ্বীপ সাল এবং বোয়া ভিস্তাতে অনেক মুসলিম বসবাস করেন।

তাদের জীবিকা মূলত বাণিজ্য ও শ্রমনির্ভর। সেনেগালিজ এবং গিনিয়ান মুসলিমরা প্রধানত খুচরা ব্যবসা, হস্তশিল্পের পণ্যের দোকান এবং নির্মাণ খাতে কাজ করেন। পর্যটন বিকাশের ফলে অনেক মুসলিম এখন বড় বড় হোটেলগুলোতে কুক, রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী বা কনসিয়ার্জ হিসেবেও নিয়োজিত।

ধর্মীয় আচার ও উৎসবের বর্ণিল রূপ

কেপ ভার্দেতে মুসলিমরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।

রমজান: পবিত্র রমজান মাসে তারা সেহরি ও ইফতারের মাধ্যমে সিয়াম পালন করেন। ইফতারে প্রথাগতভাবে খেজুর ও পানি দিয়ে রোজা ভাঙা হয় এবং পরবর্তীতে একত্রে রাতের খাবার খাওয়া হয়।
ঈদ উদযাপন: ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা সেখানে অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। রাজধানীর ‘তিরা চ্যাপেউ’ নামক মাল্টিপারপাস হলে শত শত মুসলিম একত্রে ঈদের নামাজ আদায় করেন। কোরবানি ঈদে তারা মেষ কোরবানি করেন এবং সেই মাংসের একটি অংশ প্রতিবেশী ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করেন।
মাওলিদ: মহানবী (সা.)-এর জন্মদিবস উপলক্ষ্যে তারা মিলাদ ও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করেন, যেখানে সেনেগালিজ সুফি ঐতিহ্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নেতৃত্ব

বর্তমানে দেশটিতে বেশ কিছু প্রার্থনা কেন্দ্র ও অস্থায়ী মসজিদ রয়েছে। পর্যটন দ্বীপ সালে তিনটি ছোট প্রার্থনা কেন্দ্র রয়েছে, যা স্থানীয় মুসলিমদের অর্থায়নে পরিচালিত। তবে রাজধানীর প্রধান কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রশাসনিক ও জমি সংক্রান্ত জটিলতার কারণে এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

দেশটিতে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘কমিউনিদাদে ইস্লামিকা দে কাবো ভার্দে’ এবং ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘অ্যাসোসিয়েশন ইসলামিকা ডি দাওয়াহ’ সক্রিয় রয়েছে। আইডিসিভি-এর ইমাম ইব্রাহিমা সিদি, যিনি সৌদি আরবে ইসলামি ধর্মতত্ত্বে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন, তিনি সেখানে মুসলিমদের ধর্মীয় নির্দেশনা প্রদান করেন।

সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ও সামাজিক অবদান

কেপ ভার্দেতে মুসলিমদের উপস্থিতি দেশটির ক্রেওল সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। মুসলিম অভিবাসীরা তাদের সাথে নিয়ে এসেছেন পশ্চিম আফ্রিকান খাবার যেমন—‘থিয়েবৌডিয়েন’ এবং ‘ইয়াসা’, যা এখন স্থানীয়দের কাছেও জনপ্রিয়। এছাড়া ‘আল ওয়াসিলাহ ফাউন্ডেশন’-এর মতো সংস্থাগুলো জাকাতের মাধ্যমে স্থানীয় দরিদ্র পরিবারগুলোকে খাদ্য ও সহায়তা প্রদান করে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি করছে।

চ্যালেঞ্জ ও আগামীর পথ

সংখ্যালঘু এই জনপদকে কিছু চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হয়। ২০১৪ সালের কঠোর অভিবাসন আইনের কারণে অনেক মুসলিম অভিবাসীর জন্য বসবাসের অনুমতি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

এছাড়া দারিদ্র্য এবং মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি বরাদ্দের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা বড় বাধা। এতকিছুর পরেও কেপ ভার্দেতে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের মধ্যে চমৎকার আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগে ধর্মীয় সহনশীলতা প্রচার করা হয় এবং মুসলিম নেতারা নিয়মিতভাবে দেশের শান্তি ও অগ্রগতির প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। আটলান্টিকের এই ছোট্ট ভূখণ্ডে ইসলাম আজ কেবল একটি ধর্ম নয়, বরং শান্তি, সহনশীলতা ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তথ্যসূত্র: গ্রোকিপিডিয়া

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD