সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ পূর্বাহ্ন

দৃষ্টিনন্দন জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের অপেক্ষায়

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঢাকার ওসমানী উদ্যানে নির্মিত হয়েছে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। এর বিশাল রিলিফ ভাস্কর্যে উঠে এসেছে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের নানা দৃশ্য। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা থেকে শুরু করে পুলিশি দমন, গুলিবর্ষণ, গ্রেপ্তার, কারফিউ উপেক্ষা করে ছাত্র-শিক্ষক-জনতার প্রতিরোধ এবং ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ—আন্দোলনের ৩৬ দিনের বিভিন্ন মুহূর্ত তুলে ধরা হয়েছে এই ভাস্কর্যে। পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতা হিসেবে স্থান পেয়েছে ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ ও ১৯৯০-এর চার ঐতিহাসিক অধ্যায়। রাজনৈতিকসংবাদ পড়ুন

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা স্মৃতিস্তম্ভের রিলিফ ভাস্কর্যে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন দৃশ্য প্রামাণ্য আলোকচিত্রের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, আন্দোলনকারীদের ওপর ফ্যাসিস্ট হাসিনার পুলিশের গুলিবর্ষণ, ভাঙা টিন দিয়ে পুলিশের গুলি প্রতিরোধের চেষ্টা, শিক্ষার্থীদের আটক, নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ, হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ, নিহত স্বজনের লাশ নিয়ে মিছিল, কারফিউ ভেঙে ছাত্র-শিক্ষক-জনতার রাজপথে নামা, জাতীয় শহীদ মিনার থেকে এক দফার ঘোষণা, গণভবন থেকে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়া, আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার বিজয় উল্লাস, শেখ মুজিবের বিশালাকৃতির ভাস্কর্যের গলায় রশি টাঙিয়ে টেনেহিঁচড়ে নামানোসহ ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের বিভিন্ন দৃশ্য স্থান পেয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম আমার দেশকে জানিয়েছেন, জুলাই স্মৃতিস্তম্ভটি অক্টোবর মাসে উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর সময়সূচির ওপর নির্ভর করছে। ডিজিটালম্যাপ দেখুন

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম জয় আমার দেশকে বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভকে ‘মেমোরি স্টাডিজ’-এর আধুনিক দর্শনে একটি সক্রিয় ও জীবন্ত ‘স্মৃতি-পরিসর’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। দর্শনার্থীরা এখানে শুধু স্মৃতিচিহ্ন দেখবেন না; তারা চত্বরে প্রবেশ করে শহীদদের নাম পড়বেন, রক্তাক্ত জুলাই বিপ্লবের স্মৃতিচারণ করবেন এবং ইতিহাসের গৌরবময় প্রবাহের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক অনুভব করবেন।

স্থাপত্যের পরিকল্পনায় ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবকে শূন্য থেকে শুরু হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় হিসেবে দেখা হয়নি। বরং বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও আত্মমর্যাদার দীর্ঘ আন্দোলন—বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রাম সেই ধারাবাহিক লড়াইয়ের এক নতুন ও অবিনাশী অধ্যায় হিসেবে জুলাই বিপ্লবকে স্থাপন করা হয়েছে।

প্রবেশপথে ‘24’ ও ‘5’

স্মৃতিস্তম্ভে প্রবেশের মুখে রয়েছে দুটি বিশেষ প্রবেশদ্বার। নকশায় ইংরেজি ‘24’ ও ‘5’ সংখ্যার সমন্বয়ে একটি শৈল্পিক অ্যাম্বিগ্রাম ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ‘24’ দিয়ে ২০২৪ সাল এবং ‘5’ দিয়ে ৫ আগস্টকে বোঝানো হয়েছে।

প্রবেশপথের দুই পাশে রয়েছে ১০টি করে মোট ২০টি ঘনকাকৃতির পাথুরে এপিটাফ। এতে সরকারি গেজেটভুক্ত শহীদদের পাশাপাশি পরিচয় না পাওয়া ব্যক্তিদের স্মৃতিও তুলে ধরা হয়েছে।

৯০ ফুটের বৃত্তাকার কলাম

স্মৃতি-পরিসরে প্রবেশ করতেই দৃষ্টি কেড়ে নেয় মূল চত্বর থেকে আকাশের দিকে উঠে যাওয়া কেন্দ্রীয় বৃত্তাকার কলামটি। ৯০ ফুট উচ্চতার স্তম্ভটি মূলত ঊর্ধ্বমুখী স্মৃতি ও জাতীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এটি ব্যক্তিসত্তার আত্মত্যাগকে একটি সার্বভৌম জাতির সম্মিলিত স্মৃতির উচ্চতায় উন্নীত করার শিল্প রূপক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। স্থাপত্যের কেন্দ্রে অবস্থিত এই বৃত্তাকার কলামটি জুলাই বিপ্লবের ঐতিহাসিক ‘এক দফা’ দাবির প্রতীক, যা আন্দোলনরত কোটি মানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে একটি মূল কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছিল।

কেন্দ্রীয় এই স্তম্ভটির নির্মাণশৈলীতে রয়েছে প্রকৌশল ও শিল্পকলার এক নিখুঁত মেলবন্ধন। স্তম্ভটির নিচের ২০ ফুট অংশ আরসিসি কাস্টিংয়ে তৈরি। ওপরের ৭০ ফুট অংশে ব্যবহার করা হয়েছে ব্রাসের পাত। লেজার কাটিং প্রযুক্তিতে এসব পাতের ওপর জুলাই বিপ্লবে শহীদদের নাম খোদাই করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্তম্ভের দুই পাশে রয়েছে চারটি করে মোট আটটি আয়তাকার ‘পারসিভড কলাম’। আপাতদৃষ্টিতে এগুলোকে আলাদা মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এগুলো একটি অবিচ্ছিন্ন আবদ্ধ রেখা, যা কেন্দ্রীয় বৃত্তাকার কলামের ভেতর দিয়ে অতিক্রান্ত হয়ে ১৬টি বিন্দুতে কোণ তৈরি করে দিক পরিবর্তন করেছে। এই কলামগুলো রাজনৈতিক, সামাজিক ও মতাদর্শিক নানা বৈচিত্র্য সত্ত্বেও বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। অন্যদিকে ১৬টি কোণে গতি পরিবর্তনকারী অবিচ্ছিন্ন রেখাটি নির্দেশ করে এ দেশের মানুষের অধিকার ও গণতন্ত্র অর্জনের দীর্ঘ ও আপসহীন লড়াইয়ের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। রাজনৈতিকসংবাদ পড়ুন

এশিয়ার প্রথম বাঁকানো রিলিফ ভাস্কর্য

স্মৃতিস্তম্ভের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ১,৯১৫ বর্গফুটের বিশাল রিলিফ ভাস্কর্য। প্রকল্প-সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি এশিয়ার প্রথম কার্ভড বা বাঁকানো রিলিফ ভাস্কর্য।

ভাস্কর্যটি দুটি অংশে বিভক্ত। ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও ৭ ফুট উঁচু ভেতরের অবতল দেয়ালে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ৩৬ দিনের রক্তাক্ত ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। এর আয়তন ১,১৪১ বর্গফুট। বাইরের উত্তল দেয়ালটি ১৭২ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ৪ ফুট উঁচু। ৭৭৪ বর্গফুটের এই অংশে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের চার ঐতিহাসিক অধ্যায়কে তুলে ধরা হয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সূচনা থেকে ৫ আগস্টের চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত সামগ্রিক ঘটনাপ্রবাহকে প্রধানত ৮টি বড় ধারাবাহিক থিমে সাজানো হয়েছে। এতে নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে হাসিনার পতন পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ।

রিলিফ ভাস্কর্যের দৃশ্যগুলো কাল্পনিক নয় বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র, শিক্ষক, নারী, শ্রমজীবী মানুষ এবং শহীদদের প্রকৃত অবয়বের আলোকচিত্রের ভিত্তিতে এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে এর মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দৃশ্যমান ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকে।

৩৯ কোটি টাকায় নির্মাণকাজ

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ডিএসসিসি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। মূল নির্মাণকাজ সম্পাদন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনডিই-নির্মাণ জেভি।

প্রকল্পটির প্রাথমিক চুক্তিমূল্য ছিল ৪৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। পরিকল্পনা পরিমার্জন ও সংশোধনের পর চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৩৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

অক্টোবরে উদ্বোধনের পরিকল্পনা

ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম জানান, সেপ্টেম্বর মাসে উদ্বোধন সম্ভব হচ্ছে না। আগামী অক্টোবর মাসে স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত তারিখ নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সময় দেওয়ার ওপর। সময়সূচি পাওয়া গেলে দ্রুত আনুষ্ঠানিকভাবে স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করা হবে।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD