৭ অক্টোবরের রক্তক্ষয়ী হামলায় নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে মিথ্যা ও অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছেন দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’-এর সাবেক প্রধান রোনেন বার। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে টিকে থাকার জন্য যখন নেতানিয়াহু তীব্র রাজনৈতিক লড়াই চালাচ্ছেন, ঠিক তখনই দায়ের করা এই মামলাটি দেশটির রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন নাটকীয়তা ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
১৩৪ পৃষ্ঠার দীর্ঘ এক আদালতের নথিতে রোনেন বার অভিযোগ করেছেন যে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় নিজের দায় এড়াতে এবং বিতর্ক ভিন্ন খাতে মোড় ঘুরিয়ে দিতে নেতানিয়াহু জেনেশুনে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মনগড়া তথ্য প্রচার করছেন।
গত বছরের জুনে পদত্যাগ করা সাবেক এই গোয়েন্দাপ্রধান বলেন, হামলার দিন সকালে সম্ভাব্য আক্রমণের কোনো আলামত পাওয়ামাত্রই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিবকে ফোন করে বিষয়টি অবহিত করেছিলেন, তবে সে সময় সরাসরি নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত নম্বর তার কাছে ছিল না। নিজের বিরুদ্ধে আনা ‘পেশাগত ব্যর্থতা’র অভিযোগ নস্যাৎ করে দিয়ে রোনেন বার বলেন, নেতানিয়াহুর বছরের পর বছর ধরে গ্রহণ করা বিভিন্ন নীতিই প্রকৃতপক্ষে গাজায় উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। এই মানহানি মামলায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রায় ৩০ লাখ শেকেল (যা প্রায় পৌনে দশ লক্ষ মার্কিন ডলারের সমতুল্য) ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
এই দিকে মামলা দায়েরের পরপরই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক দল লিকুদ পার্টি থেকে একটি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে। পাল্টা প্রশ্নে নেতানিয়াহু বলেছেন, রোনেন, তুমি কি সিরিয়াস? লাল ফিতার হটলাইনে আমার সরাসরি নম্বর তোমার কাছে ছিল এবং অন্য সব নিরাপত্তাপ্রধানদের মতো তুমিও আমাকে সরাসরি ফোন করতে পারতে। সময়মতো একটা ফোন করলে সেদিন কত শত মানুষের প্রাণ বেঁচে যেতে পারত!
তবে সাম্প্রতিক কিছু চাঞ্চল্যকর উন্মোচন নেতানিয়াহুর এই দাবিকে বেশ চাপে ফেলেছে। সম্প্রতি চ্যানেল ১২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহুর সাবেক সামরিক সচিব অ্যাভি গিল অভিযোগ করেন যে, ৭ অক্টোবরের হামলার দিন সকালের একটি গুরুত্বপূর্ণ চার মিনিটের ফোনালাপের সময়সীমা বিকৃত করেছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। সকাল ৬টা ৪০ মিনিটের ফোনালাপটিকে ঘড়ির কাঁটায় পিছিয়ে ৬টা ২৯ মিনিট বানিয়ে নথি পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, হামলার কয়েক দিন আগে মিসরের গোয়েন্দাপ্রধান আব্বাস কামেলও সরাসরি নেতানিয়াহুকে হামাসের বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনার বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছিলেন।
উল্লেখ্য, ৭ অক্টোবরের সেই হামলায় প্রায় ১,২২১ জন ইসরায়েলি নিহত এবং ২৫১ জন বন্দি হন। এর পর থেকে গত তিন বছরে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭৪,৩০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ১,৪০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই ভয়াবহ রক্তপাত ও নিরাপত্তা ব্যর্থতা রোধ করতে না পারার কারণে নিজ প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা এবং বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন নেতানিয়াহু, যা আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা, টাইমস অব ইসরায়েল