যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে শুধু সামরিক শক্তি নয়, কূটনীতিকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায় ইরান। দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ওয়াশিংটনকে ইরানের সঙ্গে আচরণের জন্য মূল্য দিতে হবে এবং তেহরানের দাবি মেনে ছাড় দিতে বাধ্য করতে হবে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে নতুন হামলা ঠেকাতে সামরিক প্রস্তুতি ও আলোচনার সমন্বয়ে কার্যকর প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
বুধবার সন্ধ্যায় সম্প্রচারিত এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন গালিবাফ। এ সময় তিনি ‘ইসলামাবাদ চুক্তি’ লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করেন।
গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র লিখিত বা স্বাক্ষরিত কোনো নথিতে প্রতিশ্রুতি দিলেই ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা হবে না—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। তাঁর ভাষায়, শুধু চুক্তির ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যতের সামরিক আগ্রাসন ঠেকানো সম্ভব নয়।
তবে তাঁর মতে, কেবল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কিংবা উত্তেজনা বাড়িয়েও প্রতিপক্ষকে নতুন হুমকি দেওয়া থেকে বিরত রাখা যাবে না। বরং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কূটনৈতিক আলোচনাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
ইরাকের সঙ্গে ইরানের আট বছরব্যাপী যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গালিবাফ বলেন, ওই সংঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও দুর্ভোগের মুখেও ইরান এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে দেশটির ওপর সামরিক হামলা ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছে।
তিনি বলেন, প্রতিরোধক্ষমতা বলতে শুধু অস্ত্র ও সামরিক শক্তিকে বোঝায় না। এর সঙ্গে জাতীয় ঐক্য, আঞ্চলিক প্রভাব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সামাজিক সহনশীলতাও জড়িত।
গালিবাফের বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের সামরিক কৌশলের লক্ষ্য হলো এমন সক্ষমতা অর্জন করা, যাতে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি সামরিক হামলার মাধ্যমে তেহরানের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে না পারে।
ইরানের অগ্নিশক্তি, আক্রমণাত্মক সক্ষমতা ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির কথাও তুলে ধরেন পার্লামেন্ট স্পিকার। তাঁর দাবি, ১২ দিনের যুদ্ধ এবং পরবর্তী সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে এসব সক্ষমতা আরও বেড়েছে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কৌশলগত অবস্থান এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ঐক্যকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
গালিবাফের মতে, সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি অর্থনীতি ও সমাজের সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি। কারণ, দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে একটি দেশের সামগ্রিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গালিবাফ বলেন, প্রয়োজনে পূর্ণ শক্তি দিয়ে আত্মরক্ষার জন্য ইরানকে প্রস্তুত থাকতে হবে। একই সঙ্গে সামরিক অর্জনগুলোকে সুসংহত করা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কূটনৈতিক সুযোগ কাজে লাগানো প্রয়োজন।
তাঁর যুক্তি, সামরিক সাফল্যকে রাজনৈতিক ও আইনি অর্জনে রূপান্তর করা উচিত। অন্যদিকে, আলোচনার মাধ্যমে সময় ও সম্পদ অর্জন করে ইরান নিজেদের সক্ষমতা আরও জোরদার করতে পারে।
তিনি স্পষ্ট করেন, যুদ্ধ ও আলোচনার সমন্বিত কৌশলের অর্থ অনির্দিষ্টকাল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কিংবা চিরকাল আলোচনা চালিয়ে যাওয়া নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষকে ইরানের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করা।
গালিবাফের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের দাবিতে সম্মত না হয়, তাহলে দেশটিকে পরাজয় মেনে নেওয়া এবং এমন ছাড় দিতে হবে, যা ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে।
বক্তব্যের শেষ দিকে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা এবং সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন গালিবাফ।
তিনি বলেন, জনগণের ওপর থাকা অর্থনৈতিক চাপ কমাতে দেশের নিজস্ব সম্পদ ও সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমানের কঠিন পরিস্থিতিকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনায় রূপ দেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।
গালিবাফের বক্তব্যে স্পষ্ট, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত মোকাবিলায় সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি কূটনীতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং অভ্যন্তরীণ সংহতিকেও প্রতিরোধকৌশলের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। তবে এই কৌশল বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে সংঘাতের গতিপ্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ আলোচনার অগ্রগতির ওপর। মেহের নিউজ