সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক গুম ও হত্যার অভিযোগে করা মামলার দশম সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন মাঝি আব্বাস মল্লিক। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানিতে তিনি বলেছেন, র্যাবের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের গুলি করে হত্যার পর পেট কেটে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে বলেশ্বর নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এসব কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বে ছিলেন জিয়াউল আহসান।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০১০ ও ২০১১ সালে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় র্যাবের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের হত্যা ও লাশ গুমের ঘটনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন।
আব্বাস মল্লিক বলেন, ‘অভিযানের সময় সাদা পোশাকে র্যাবের দুই সদস্য তাদের এলাকায় গিয়ে স্থানীয় দোকানিদের সন্ধ্যার পর দোকান বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে রাখতে বলতেন। এরপর রাত ১১-১২টার দিকে চার-পাঁচটি মাইক্রোবাস ওই এলাকার বরফ মিলের সামনে এসে থামত। ঢাকা থেকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় বন্দিদের সেখানে এনে ট্রলারে তোলা হতো।
বন্দিদের নিয়ে যাওয়ার সময় র্যাব সদস্যরা রশি ও সিমেন্টের বস্তা সঙ্গে নিতেন। ট্রলারটি বলেশ্বর নদীর গভীরে যাওয়ার পর গতি কমিয়ে দেওয়া হতো। এরপর চোখ ও হাত বাঁধা বন্দিদের ট্রলারের ভেতর থেকে বের করে আনা হতো।’
আব্বাস মল্লিকের দাবি, ট্রলারের দুই পাশে থাকা সাপোর্টের অংশে দুই র্যাব সদস্য বন্দিদের চেপে ধরে রাখতেন। পরে জিয়াউল আহসান এসে বন্দিদের মাথা, কান অথবা বুকে গুলি করতেন। এরপর মৃতদেহের গলা অথবা পায়ে সিমেন্টের বস্তা বেঁধে নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। লাশ যেন পানিতে ভেসে না ওঠে, সে জন্য নদীতে ফেলার আগে পেট কেটে দেওয়া হতো।
‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে লাশ হস্তান্তর
আব্বাস মল্লিক আরও জানান, বলেশ্বর নদীতে বন্দিদের হত্যার পর অন্য বন্দিদের নিয়ে সুন্দরবনের দিকে যাওয়া হতো। সেখানে তাদের নামিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো। পরে সাংবাদিকদের ডেকে থানায় লাশ হস্তান্তর করা হতো।
হত্যাকাণ্ড শেষে বরফ মিলে ফিরে এলে মাঝিদের খামে করে দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো বলেও সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন তিনি।
আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজের ঘটনা তুলে ধরেন আব্বাস মল্লিক
সাক্ষ্যে নিজের ছোট ভাই আলকাছ মল্লিকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন আব্বাস মল্লিক। তিনি জানান, আলকাছের দুটি ট্রলার ছিল এবং তিনি র্যাবের সঙ্গে কাজ করতেন। র্যাবের কথিত কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আলকাছ স্থানীয় বাজারে আলোচনা করায় অন্য বোটের মালিকেরা তাকে সতর্ক করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, র্যাব তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে আছে।
আব্বাস মল্লিক জানান, ২০১১ সালের মাঝামাঝি একদিন দুপুরের খাবার খেয়ে বাড়ি থেকে বের হন আলকাছ। এর আগে, র্যাব থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয়, জিয়া স্যার তাকে বটতলা-মানিকখালীতে ডেকেছেন। ওই দিন সন্ধ্যার পর থেকেই আলকাছের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ভাইকে খুঁজতে খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও ঢাকার র্যাব কার্যালয়ে ঘুরেছেন বলেও ট্রাইব্যুনালকে জানান আব্বাস। তার দাবি, পাথরঘাটা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলেও পুলিশ সেখানে জিয়াউল আহসান ও র্যাবের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হয়নি।
সাক্ষ্যের শেষ পর্যায়ে কাঠগড়ায় থাকা সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানকে সরাসরি শনাক্ত করেন আব্বাস মল্লিক।