মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৫ অপরাহ্ন

বামপন্থি নেতৃত্বে যেভাবে ঘুরে দাঁড়াল ‘দেউলিয়া’ শ্রীলঙ্কা

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বামপন্থি নেতৃত্বের হাতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি। কয়েক বছর আগেও দেশটিতে ছিল তীব্র খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, চারদিকে ছিল হাহাকার। আজ সেখানে স্বস্তি ফিরছে। খাদের কিনারা থেকে এই পথ পরিবর্তন মোটেও সহজ ছিল না শ্রীলঙ্কার জন্য। বিশেষ করে, একজন বামপন্থি নেতার হাত ধরে দেশটির এই অর্থনৈতিক পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার কর্মসূচির ফলেই শ্রীলঙ্কা আজকের এই অবস্থানে পৌঁছাতে পেরেছে।

শ্রীলঙ্কার এই সংকটের শুরু হয়েছিল ভুল সরকারি নীতি ও বৈদেশিক ঋণের পর্বতসম বোঝার কারণে। ২০১৯ সালের ট্যাক্স কাট, করোনা মহামারি এবং পর্যটন খাতের বিপর্যয় দেশটিকে চরম সংকটে ফেলে দেয়। কৃষিতে হঠাৎ রাসায়নিক সার নিষিদ্ধ করার মতো নীতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় শেষ হয়ে যায়। তাতে জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। দেশজুড়ে দেখা দেয় খাদ্য ও ওষুধের সংকট।

মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায় ৭০ শতাংশের ওপরে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকত না। পেট্রল ও ডিজেলের জন্য মানুষকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হতো।

একপর্যায়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে শ্রীলঙ্কা। ৫১ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে খেলাপি হয় তারা। এটি ছিল দেশটির ইতিহাসে প্রথম সার্বভৌম ঋণখেলাপি।

চরম অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিক্রিয়ায় দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র গণ-অসন্তোষ, যা ইতিহাসে ‘আরাগলায়া’ বা গণ-সংগ্রাম নামে পরিচিত।

বিক্ষুব্ধ জনতা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের বাসভবনে চড়াও হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি।

এরপর রাজনৈতিক এক সমঝোতার মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নেন রনিল বিক্রমাসিংহে। তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেইলআউট প্যাকেজ সচল করার চেষ্টা করেন। তবে তার কঠোর কর নীতি এবং ব্যয় সংকোচন সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে।

জনগণের মধ্যে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি চরম অনাস্থা তৈরি হয়। দুর্নীতিমুক্ত ও গণমুখী এক নতুন নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা তীব্র হয়ে ওঠে।

ঠিক এই রাজনৈতিক ও সামাজিক শূন্যতার মধ্যে উত্থান ঘটে ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ারের (এনপিপি) বামপন্থি নেতা অনুরা কুমারা দিশানায়েকের।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, রাজনৈতিক অভিজাতদের বিশেষ সুবিধা কমানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অনুরাকে সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় পান তিনি। পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় তার জোট।

অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, একজন মার্ক্সবাদী নেতা ক্ষমতায় আসলে হয়তো বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে। এমনকি আইএমএফের সঙ্গে চুক্তিও বাতিল হতে পারে বলে ভাবা হয়েছিল।

কিন্তু অনুরা দিশানায়েকে প্রমাণ করেছেন, তিনি ভাবাদর্শের চেয়ে বাস্তবমুখী অর্থনীতিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি ক্ষমতায় এসেই আইএমএফের কর্মসূচির মৌলিক শর্তগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ঘোষণা দেন। তবে একই সঙ্গে এতে যুক্ত করেন নিজস্ব সংস্কার এজেন্ডা।

অনুরা দিশানায়েকের বামপন্থি সরকার কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে।

রাজস্ব প্রশাসন শক্তিশালী করা, ভ্যাট ব্যবস্থায় সংস্কার, কর আদায় বাড়ানো এবং দুর্নীতি কমানোর উদ্যোগের পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ কমাতে বেশ কিছু করছাড় দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে গাড়ি আমদানি ফের চালু করার সঙ্গে ৩০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করেছে লঙ্কান সরকার। অবৈধ ব্যবসা এবং কালোবাজারি চক্রের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান দেশে আর্থিক স্বচ্ছতা ফেরাতে সাহায্য করছে।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও ব্যাপক সংস্কার আনা হয়েছে। চা বাগান কর্মীদের দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্রকল্প চালু করা হয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। একই সময়, বিদেশি ঋণ পুনর্গঠন প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সুফল এখনো সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

ঘুরে দাঁড়ানোর বাস্তব চিত্র

বর্তমান সময়ে এসে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি এক অভাবনীয় মাইলফলক স্পর্শ করেছে। দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। একসময়ের আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় অবদান রাখছে পর্যটন খাতের অভাবনীয় পুনরুত্থান এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স।

আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫ সালে শ্রীলঙ্কার পাঁচ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চের শেষে দেশটির সরকারি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে প্রায় সাত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

রাজস্ব আদায়ও শক্তিশালী হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটি ২ হাজার ৫৫৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন রুপি রাজস্ব সংগ্রহ করে, যা তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

ঋণ পুনর্গঠন এগিয়ে যাওয়ায় দেশটির ঋণ পরিস্থিতিও আগের তুলনায় টেকসই অবস্থার দিকে যাচ্ছে।

সামনে আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ
শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ালেও সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি।

আইএমএফের কর্মসূচির আওতায় রাজস্ব বাড়ানো এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণের কারণে জনগণের ওপর কর ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ রয়েছে। দারিদ্র্য ও আয়বৈষম্যের প্রভাবও পুরোপুরি কাটেনি।

তাছাড়া, আইএমএফের সর্বশেষ মূল্যায়ন বলছে, ২০২৬ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় তিন শতাংশে নেমে আসতে পারে।

তেলের চড়া দাম, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং পর্যটন আয়ে সম্ভাব্য ধাক্কা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ পুনরুদ্ধারের পথ এখনো ঝুঁকিমুক্ত নয়।

তবু সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি অন্য জায়গায়। দেউলিয়া হয়ে যাওয়া একটি দেশ এখন আবার প্রবৃদ্ধির পথে। রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বেরিয়ে এসেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। ঋণ পুনর্গঠনের কাজ এগিয়েছে। আর এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন একজন নেতা, যার রাজনৈতিক পরিচয়ের শিকড় বামপন্থি ও মার্কসবাদী রাজনীতিতে।

এক নতুন শ্রীলঙ্কার বার্তা

অনুরা কুমারা দিশানায়েকে বিশ্বকে দেখিয়েছেন, কেবল পুঁজিবাদী বা সমাজতান্ত্রিক তত্ত্বের অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং সুশাসন ও বাস্তববাদী নীতিমালার মাধ্যমেই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। সংকটকে শক্তিতে রূপান্তর করে কীভাবে দুর্নীতি দূর করা যায় এবং অর্থনীতিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায়, শ্রীলঙ্কা এখন তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য শ্রীলঙ্কার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প এক বড় ধরনের অনুপ্রেরণা।

সূত্র: রয়টার্স, এপি, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ, আইএমএফ

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD