শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৪ অপরাহ্ন

বিক্ষোভ মোকাবিলায় দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করলো ফ্রান্স

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

বিক্ষোভ-সহিংসতা মোকাবিলায় দেশজুড়ে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করেছে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর নেতৃত্বাধীন সরকার। বিক্ষোভকারীদের শনিবারের কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে আজ ২৪ অক্টোবর থেকেই মোতায়েন করা হয়েছে পুলিশ।

ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার নিজের প্রতিরক্ষা পরিষদের (এ পরিষদে শীর্ষ মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা রয়েছেন) সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গেও তার আলোচনার পরিকল্পনা ছিল।

এদিকে, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে জনসমাগম ও গণপরিবহন চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিরক্ষা পরিষদের বৈঠকের পর তিনি ‘আরও কিছু সিদ্ধান্ত’ ঘোষণা করবেন। প্রেসিডেন্ট এই অস্থিরতার জন্য ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ উগ্র-বামপন্থী দলগুলোকে দায়ী করেছেন।

শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন যে শনিবার দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে—যা গত সপ্তাহের শনিবারের তুলনায় প্রায় ১০ হাজার বেশি। এই ৭০ হজাার পুলিশের মদ্যে ফরাসি পুলিশ বাহিনীর এলিট ইউনিট, অশ্বারোহী পুলিশ ইউনিট, হেলিকপ্টার, ড্রোন, সাঁজোয়া যান এবং জলকামান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

উগ্র-বামপন্থী’ গোষ্ঠীগুলো অনলাইনে তাদের কর্মীদের সরকারি ভবনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার আহ্বান জানাচ্ছে উল্লেখ করে শুক্রবার সাংবাদিকদের নুনেজ বলেন, “দাঙ্গাবাজ, লুটতরাজকারী এবং যারা সহিংসতায় লিপ্ত হবে, তাদের প্রতি আমরা কোনো নমনীয়তা দেখাব না।”

তিনি বলেন, “আমরা কোনো শান্তিপূর্ণ বা বন্ধুত্বপূর্ণ বিক্ষোভের কথা বলছি না। আমরা অত্যন্ত সতর্ক ও কঠোর থাকব; কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলাকেই ছাড় দেওয়া হবে না। গত সপ্তাহে কিছু সংবেদনশীল এলাকায় যে কারফিউ জারি করা হয়েছিল, তা বহাল থাকবে।”

বৃহস্পতিবার এক ঘোষণায় প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেছিলেন, আজ শনিবার কেবল শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর বিক্ষোভকেই অনুমতি দেওয়া হবে। তার এই ঘোষণার তীব্র সমালোচনা করেছে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে স্কুলগুলোর পরিস্থিতির প্রতিবাদে তারা বিক্ষোভ করছিল, যার সঙ্গে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও অন্যান্য অভিযোগ নিয়ে আন্দোলনরত বিভিন্ন গোষ্ঠীও যোগ দিয়েছিল।

গত শনিবার ফ্রান্সজুড়ে ৫ লাখেরও বেশি মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল, তবে সেই কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত সহিংসতা ও লুটপাটের ঘটনায় পরিণত হয়।

রাজধানী প্যারিসে রাতের কারফিউ সোমবার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফ্রান্সের তৃতীয় বৃহত্তম শহর লিওঁ-তে কেন্দ্রীয় এলাকায় জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং শনিবারের জন্য কারফিউ ও গণপরিবহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। উপকূলীয় শহর মার্সেইতেও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ ছিল, তবে শুক্রবার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, ‘বিশেষ বিবেচনায়” সেখানে শ্রমিক ইউনিয়নের একটি মিছিলের অনুমতি দেওয়া হবে।

এদিকে শুক্রবার ম্যাক্রোঁ প্রথমবারের মতো হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ

‘হাইস্কুল রিনিউয়াল’ নামের প্রচারণামূলক শিক্ষার্থী সংগঠনের সভাপতি নাথানায়েল কম্বারি জানিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট তাদের কথা ‘মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন’, তবে শিক্ষার্থীরা সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের অপেক্ষায় রয়েছে।

সাংবাদিকদের কম্বারি বলেছেন, “প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করে আমরা সন্তুষ্ট নই,” এবং শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানান, তারা যেন “সংগঠিত হওয়ার আন্দোলন পরিকল্পনা অব্যাহত রাখে।”

সরকার স্বাধীনতাকে ‘পদদলিত’ করছে, অভিযোগ শিক্ষার্থীদের

এদিকে বিভিন্ন বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও, ফ্রান্সের জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন ‘ইউএনইএফ’ শনিবার সমাবেশের ডাক দিয়েছে। এ সমাবেশের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে ২০১৮ সালে প্রথম আত্মপ্রকাশ করা সরকারবিরোধী আন্দোলন ‘ইয়েলো ভেস্ট’ প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে একটি পদযাত্রার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ প্যারিসে কেবল শ্রমিকদের ইউনিয়নকে সীমিত পথে বিক্ষোভ প্রদর্শনের অনুমতি দিয়েছে; অন্যদিকে ইউএনইএফ এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের আয়োজিত সমাবেশের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ইউএনইএফ জানিয়েছে, তারা তাদের কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।

রাজধানীর দক্ষিণে অরলিয়ঁ শহরে ফ্রান্সের বিরোধীদলীয় নেত্রী মেরিন ল্য পেনের কট্টর ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র‍্যালি’ তাদের দলীয় কংগ্রেস আয়োজন করছে। এর প্রতিবাদে সেখানে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মানুষ বিক্ষোভ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, শহরের কেন্দ্রস্থলে এই জমায়েত হতে দেওয়া হবে না।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ফরাসি সরকারের সাম্প্রতিক এসব বিধিনিষেধকে ‘কর্তৃত্ববাদী আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়া’ হিসেবে অভিহিত করেছে, যা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করার অধিকারকে বিপন্ন করে তোলে। এছাড়া, ভিড় নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত অস্ত্রের আঘাতে শিক্ষার্থী ও অপ্রাপ্তবয়স্করা গুরুতর আহত হয়েছে—এমন খবরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ফরাসি শ্রমিক সংগঠন ডেমোক্রেটিক কনফেডারেশন অফ লেবার ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মারিলিস লিওঁ বলেছেন, জনগণের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে, তা বিবেচনায় নিলে এই নিষেধাজ্ঞাগুলো “উল্টো ফল বয়ে আনবে।”

ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংগঠন ইউএনইএফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “ম্যাক্রোঁ আমাদের দেশে বিক্ষোভ করার স্বাধীনতাকে পদদলিত করছেন এবং তিনি যে প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধ রক্ষার দাবি করেন, তার ওপরই অপমানজনক আচরণ করছেন।”

প্রধান শহরগুলোতে দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। শনিবার ল্যুভর জাদুঘর এবং লুই ভুইতোঁ ফাউন্ডেশন বন্ধ থাকবে। এছাড়া, প্যারিসে আয়োজিত ‘আর্ট বাসেল’ (Art Basel) মেলা নির্ধারিত সময়ের দুই দিন আগেই, শুক্রবার শেষ হয়ে যাবে।

বিচার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবারের সহিংসতার পর থেকে এ পর্যন্ত ২ হাজার ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সূত্র : আলজাজিরা

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD