সাধারণ ফ্যানের বদলে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ব্রাশলেস ডাইরেক্ট কারেন্ট (বিএলডিসি) ফ্যান ব্যবহার বাড়ানো গেলে গ্রীষ্মকালে দেশের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দুই হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
এতে বছরে সর্বোচ্চ ছয় হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় আট হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।
পাশাপাশি ভবিষ্যতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ এড়ানো সম্ভব। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিসিসের (আইইইএফএ) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
গতকাল সোমবার প্রকাশিত ‘হাউসহোল্ড স্পেস কুলিং ইন বাংলাদেশ : রোল অব এনার্জি-এফিশিয়েন্ট ফ্যানস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহারের সম্ভাবনা ও এই খাতে সরকারের করণীয় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আইইইএফএর বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রীষ্মকালে বাসাবাড়িতে ফ্যান ব্যবহারের কারণে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা তৈরি হয় পাঁচ হাজার ২১২ মেগাওয়াট। অথচ দেশে ব্যবহৃত মোট ফ্যানের মাত্র ১.৪ শতাংশ বিএলডিসি প্রযুক্তির। সাধারণ ফ্যান চালাতে যেখানে ৭০ ওয়াট বা তার বেশি বিদ্যুৎ লাগে, সেখানে বিএলডিসি ফ্যানে প্রয়োজন হয় মাত্র ৩৫ ওয়াট।
দেশের ২৬ জেলার ৪৩৫টি পরিবারের ওপর জরিপ চালিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে।
এতে দেখা গেছে, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান সম্পর্কে বেশির ভাগ পরিবারেরই ধারণা নেই। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৫ শতাংশ পরিবার বাজারে এ ধরনের ফ্যান পাওয়া যায়, সে বিষয়েই অবগত নয়। তবে এসব ফ্যান ব্যবহারে বিদ্যুৎসাশ্রয়ের বিষয়টি জানার পর ৯৬ শতাংশ পরিবার বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে জাতীয়
গ্রিডের বিদ্যুতের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় আবাসিক খাতে। এ খাতে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) ব্যবহার বিদ্যুতের চাহিদা বাড়াচ্ছে।
ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
আইইইএফএর বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) জন্য চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের ব্যবহার বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদা কমবে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারের মাধ্যমে বছরে সর্বোচ্চ ছয় হাজার ৯১৩ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৭৩ কোটি ডলার বা আট হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। একই সঙ্গে গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দুই হাজার ৫৯০ মেগাওয়াট কমানো গেলে ভবিষ্যতে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৪০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না।
তবে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যানের দাম বেশি হওয়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য তা কেনা কঠিন। একটি সাধারণ ফ্যানের দাম প্রায় দুই হাজার টাকা। অন্যদিকে বিএলডিসি ফ্যানের দাম পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার ৩০০ টাকা। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারের মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকা বা তার কম। এসব পরিবারের গ্রীষ্মকালীন গড় মাসিক বিদ্যুৎ বিল ৬৬৩ টাকা। আর্থিক সহায়তা ছাড়া বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের মাধ্যমে বিএলডিসি ফ্যানের বাড়তি দাম পুষিয়ে নিতে এসব পরিবারের ৭.৭ থেকে ৯.৬ বছর সময় লাগতে পারে। তবে বড় পরিসরে একসঙ্গে ফ্যান কেনা এবং কার্বন ক্রেডিট বিক্রির অর্থ ব্যবহার করা গেলে এ সময় কমে ৪.৮ বছরে নেমে আসতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএলডিসি ফ্যানের ব্যবহার বাড়াতে সাতটি সুপারিশ করেছে আইইইএফএ। এর মধ্যে রয়েছে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্যান ব্যবহারে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, ফ্যানের মান নির্ধারণ ও লেবেলিং নির্দেশিকা চূড়ান্ত করা, বড় পরিসরে ফ্যান কেনার উদ্যোগ, স্বল্প আয়ের পরিবারের জন্য সহজ অর্থায়ন, কর্মসূচি বাস্তবায়নে সুপার এনার্জি সার্ভিস কম্পানি (ইএসসিও) গঠন এবং ফ্যানের মান নিয়ন্ত্রণ ও কর্মসূচির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ।