বৃহস্পতিবার, ০২ জুলাই ২০২৬, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ন

বেনজীরকে ফেরানো নিয়ে শঙ্কা!

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

পাহাড়সম অপকর্মে বিতর্কিত ও সমালোচিত পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ দুবাইয়ে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর তাকে ফেরানোর জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। তাকে আটকের বিষয়টি গত ১২ জুন দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল শাখা চিঠি পাঠিয়ে বাংলাদেশ পুলিশকে জানিয়েছে। এরপর ১৯ জুন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাকে ফেরানোর জন্য ২৪৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট দুবাই পুলিশের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু ডকুমেন্ট পাঠানোর পর সরকার আশানুরূপ সাড়া পায়নি।

সূত্র জানায়, দুবাই পুলিশের কাছে পাঠানো ডকুমেন্টে বেনজীরের বিস্তারিত বায়োডাটা, দুদকের ছয়টি মামলার নথিপত্র, একটি মামলায় সাক্ষ্য চলার বিষয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অভিযোগ, গুমের অভিযোগ, অর্থ পাচার, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, আদালতের বিভিন্ন আদেশ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার নামে প্রচারিত সংবাদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে সংগৃহীত নানা তথ্য-উপাত্ত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলাকালীন দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও বেনজীরের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ১৭টি, দুদকের ছয়টি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) তিনটি পরোয়ানার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে।

সরকার আশা করেছিল, বেনজীরের বিষয়ে ২৪৪ পৃষ্ঠার নথিপত্রে যা পাঠানো হয়েছেÑসেগুলো পেয়ে দুবাই পুলিশ দ্রুত রেসপন্স করবে। কিন্তু ১২ দিন পার হয়ে গেলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বেনজীরকে ফেরানোর আশা ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে। তবে তাকে ফেরাতে দুবাই পুলিশসহ বিভিন্ন চ্যানেলে সরকার যোগাযোগের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহদাত হোসাইন জানান, ‘সাবেক আইজিপি বেনজীরের নথিপত্র পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তাকে ফেরানোর বাকি কাজ সরকারের।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বেনজীরকে ফেরাতে কূটনৈতিক চ্যানেলেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। তাকে ফেরানো সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। ওই কর্মকর্তা আরো জানান, কূটনীতিক চ্যানেলে সরকার দুবাই কর্তৃপক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বহু মামলায় অভিযুক্ত বেনজীরকে ধরতে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থার (ইন্টারপোল) মাধ্যমে রেড নোটিস জারি করা হয়েছিল। ওই নোটিসের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরতের জন্য চিঠি দিয়েছে।

গত ১২ জুন দুবাই বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইটে ওঠার জন্য অন্য যাত্রীর মতোই ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় আসেন তিনি। বিমানবন্দরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরা তার মুখমণ্ডল স্ক্যান করে। স্ক্যানের তথ্য আন্তর্জাতিক অপরাধীদের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলে বেনজীরের নামে থাকা ইন্টারপোলের সতর্কতা সংকেত (নোটিস) সামনে আসে। এরপর দুবাই পুলিশের ইন্টারপোল সমন্বয় শাখা বিষয়টি যাচাই করে তাকে আটক করে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তিন কারণে বেনজীরকে ফেরানো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমত দুবাইয়ে যাদের বড় ব্যবসা-বাণিজ্য আছে, সরকার সেসব ব্যক্তিকে আটক করলেও তাদের নিজ দেশে হস্তান্তর খুব কম করে থাকে। কারণ, হস্তান্তর করলে ওই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে লেনদেন কমে যায় এবং অন্য দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরা ভয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে নিতে পারে বলে আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে বড় ফৌজদারি অপরাধ না থাকলে শুধু অর্থ পাচারের মামলা থাকলে অন্য দেশের পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে না দুবাই পুলিশ। বেনজীরের বিষয়ে এ দুটি মিলে যাওয়ায় তাকে ফেরানো নিয়ে সংশয়ে রয়েছে বাংলাদেশের পুলিশ।

সূত্র জানায়, বেনজীরের মুক্তির জন্য দুবাইয়ে তার ব্যবসায়ী বন্ধুরা তৎপর রয়েছেন। বিশেষ করে বেলজিয়ামে পালিয়ে যাওয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ তৎপরতা চালাচ্ছেন। দুবাইয়ে থাকা হাছানের বন্ধু ফাইজুল ইসলাম এ বিষয়ে বেশ তৎপর। ফাইজুল ইতোমধ্যে দুবাই পুলিশকে বেনজীরের বিষয়ে একটি আবেদনপত্র দিয়েছে বলে জানা গেছে। হাছান মাহমুদ-ফাইজুল সিন্ডিকেট তাকে মুক্ত করতে নানা তদবির করছে। এ অপতৎপরতার বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও দুবাই পুলিশকে একটি চিঠি পাঠানোর বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে।

সূত্র জানায়, বেনজীর যাতে ছাড়া না পান, এজন্য আরেকটি পক্ষ সক্রিয় রয়েছে। বড় একটি গ্রুপ অব কোম্পানির এ পক্ষটি তাকে দুবাই পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সক্রিয় ছিল। বেনজীর আইজিপি থাকাকালে এক নারীর লাশ উদ্ধার ঘিরে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার ঠাণ্ডা লড়াই চলছিল।

জানা গেছে, সাবেক আইজিপি বেনজীরের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, শাপলা গণহত্যা ও গুমের অভিযোগ রয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এবং ট্রেজারি বিভাগ র‍্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীরের নামও ছিল। তিনি নানা কেলেঙ্কারি করে একাধিক দেশের পাসপোর্টও নিয়েছেন। দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পর ২০২৪ সালের ৪ মে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের ছত্রছায়ায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই চলে যান তিনি। দুবাই ছাড়াও তিনি তুরস্ক, স্পেন ও মরক্কোতে থাকতেন।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ২ জুলাই রাজশাহীতে একটি অনুষ্ঠানে তৎকালীন আইজিপি বেনজীরের বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘ব্যক্তির দায় পুলিশ নেবে না। এ বিষয়ে আপনাদের স্পষ্ট করে বলতে চাইÑবাংলাদেশ পুলিশ কখনো ব্যক্তির দায় সংগঠন হিসেবে নেয় না। যেভাবে এর তদন্ত প্রক্রিয়া চলছে, সে অনুযায়ী এটি নিষ্পত্তি হবে। সব সময়ই আপনারা দেখেছেন, কোনো অপরাধের বিষয়ে যখনই আমাদের কাছে খবর আসে, সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। আমরা কোনো বিষয়কে খাটো করে দেখি না।’

জানা গেছে, বেনজীর ২০১০ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ২০১৫ সালের ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের এপ্রিল পর্যন্ত র‌্যাবের মহাপরিচালক এবং ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপি ছিলেন। ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যান। অবসরের পর তিনি রংধনু গ্রুপের সঙ্গে ব্যবসায় সম্পৃক্ত হন।

সূত্র : আমার দেশ

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD