রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন

ভোগান্তির কারণ প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বসানো বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার এখন অনেক গ্রাহকের জন্য নতুন ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিল পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং বিদ্যুতের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্য নিয়ে চালু করা এই ব্যবস্থা এখন অনেকের কাছে উল্টো উদ্বেগ ও অসন্তোষের কারণ হয়ে উঠছে।

বিদ্যুতের বিল পরিশোধ প্রক্রিয়া সহজ করা, বকেয়া কমানো এবং বিদ্যুতের অপচয় নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে কয়েক বছর আগে ধাপে ধাপে প্রিপেইড মিটার চালু করে সরকার। পুরনো ডিজিটাল বা পোস্টপেইড মিটার সরিয়ে বাসাবাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বসানো হয় নতুন এই মিটার।

কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকদের অভিযোগ, সুবিধার কথা বলে চালু করা এই ব্যবস্থায় তারা এখনও সেই প্রত্যাশিত স্বস্তি পাচ্ছেন না। বরং প্রযুক্তিগত জটিলতা, রিচার্জ সমস্যার ঝামেলা এবং বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগে তাদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।

মিটার হঠাৎ লক হয়ে যাওয়া, সার্ভার জটিলতার কারণে রিচার্জ করতে না পারা কিংবা অস্বাভাবিক হারে টাকা কেটে যাওয়ার মতো অভিযোগ প্রায়ই শোনা যাচ্ছে গ্রাহকদের কাছ থেকে।

অনেকের মতে, প্রিপেইড মিটারে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেও খরচের হিসাব অনেক সময় পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় না। ফলে রিচার্জ করার পর বিভিন্ন খাতে টাকা কেটে নেওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মতো জুরাইন, শ্যামপুর, কদমতলীসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি এলাকায় প্রিপেইড মিটার বসানো হয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, নতুন এই ব্যবস্থায় তাদের খরচ কমার বদলে অনেক ক্ষেত্রে বরং বেড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মিটার রিচার্জ করতে গিয়ে ভুল করে তিনবার ভুল ডিজিট চাপলে মিটার সঙ্গে সঙ্গে লক হয়ে যায়। তখন বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায় এবং মিটার আনলক করতে বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করতে হয়। অনেক সময় সার্ভার সমস্যার কারণে রিচার্জ করাও সম্ভব হয় না। এতে অনেক গ্রাহককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হয়।

সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো মিটারের অতিরিক্ত চার্জ।

এ বিষয়টি নিয়ে গ্রাহকদের ক্ষোভও বেশি। কেননা, মিটার রিচার্জ করার সঙ্গে সঙ্গে মিটার ভাড়া, সার্ভিস চার্জ ও ভ্যাট কাটা হয়। আরও কাটা হয় ডিমান্ড চার্জ। গ্রাহকদের প্রশ্ন, কোনো বিল্ডিংয়ে সংযোগ নেওয়ার সময় বিদ্যুতের ডিমান্ড চার্জ দেয় মালিকগণ। সে হিসেবে মিটারের দাম আগেই পরিশোধ করা হয়। এ ক্ষেত্রে সংযোগের ডিমান্ড চার্জ কেটে নেওয়া হলে মিটার প্রতি এ চার্জ কেন প্রতিনিয়ত কেটে নেয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান?
জুরাইন এলাকার বাসিন্দা মাহমুদুল হাসান রাসেল বলেন, আগে মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে বিদ্যুৎ বিল আসত। কিন্তু প্রি-পেইড মিটার বসানোর পর একই ব্যবহারে এখন প্রায় দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে। প্রতি রিচার্জে ডিমন্ডি চার্জ কেটে নিচ্ছে সরকার। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের চার্জ, ভ্যাট, মিটার ভাড়া কাটা হয়। সংযোগ নেওয়ার সময় যদি ডিমান্ড পূরণ করা হয়, তাহরে রিচার্জ প্রতি ফের ডিমন্ড চার্জ কেন কাটা হয়, সেটির কোনো উত্তর মেলে না। এতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি বাড়ছেই।

কদমতলী থানার মুরাদপুর এলাকার বাসিন্দা কুলসুম আক্তার জানান, মাঝেমধ্যে মিটার হঠাৎ লক হয়ে যায়। তখন বাসায় ছোট বাচ্চাদের নিয়ে বড় বিপদে পড়তে হয়। বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ না করলে আবার সংযোগ চালু করা যায় না।

পাটেরবাগ এলাকার গ্রাহক মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন জরুরি ব্যালান্স সুবিধা নিয়েও। তার ভাষায়, অনেক সময় মিটারে টাকা শেষ হয়ে গেলে জরুরি ব্যালান্স নেওয়া যায়। কিন্তু পরে রিচার্জ করলে সেই টাকা অতিরিক্ত চার্জসহ কেটে নেওয়া হয়। এতে খরচ আরও বেড়ে যায়।

শ্যামপুর এলাকার অনেক গ্রাহক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা নিজেরাই মিটার কিনে লাগিয়েছি। তারপরও প্রতি মাসে ৪০ টাকা করে মিটার ভাড়া এবং অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ কাটা হয়। এটা গ্রাহকদের জন্য অন্যায্য।

এছাড়া তাদের অভিযোগ, অনেক জায়গায় গ্রাহকদের মতামত না নিয়েই পুরনো মিটার খুলে প্রিপেইড মিটার বসানো হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে রাজধানীর শ্যামপুরে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) বিদ্যুৎ বিতরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা রুবেলসহ সংশ্লিষ্টরা বলেন, সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হচ্ছে এবং মিটার ভাড়াসহ অন্যান্য চার্জ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নেওয়া হয়।

তাদের দাবি, প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের ওপর গ্রাহকের নিয়ন্ত্রণ বেশি থাকে এবং বিল বকেয়ার ঝুঁকি কমে। তবে কোথাও প্রযুক্তিগত সমস্যা বা ভুল বোঝাবুঝি থাকলে তা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। পাশাপাশি গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুতের অপচয় কমানো এবং বিল আদায় নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রযুক্তিগত ত্রুটি, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং গ্রাহকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকার কারণে অনেক জায়গায় উল্টো গ্রাহকদের ভোগান্তি তৈরি হচ্ছে।

তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত ত্রুটি দূর করা এবং গ্রাহকদের পরিষ্কার তথ্য দেওয়ার উদ্যোগ না নিলে এই অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

এদিকে ভুক্তভোগী অনেক গ্রাহক বলছেন, বর্তমান অবস্থায় প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার সংস্কার করা জরুরি। অন্যথায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD