সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০২ পূর্বাহ্ন
বৈদেশিক কর্মসংস্থান

সৌদি আরবে হুতিদের হামলা, শ্রমবাজার আরও ঝুঁকিতে

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

ইরানের ওপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বাংলাদেশিদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমেছে প্রায় ৪০ শতাংশ। গত ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত (সাত মাস ১০ দিন) চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন চার লাখ ১৭ হাজার ৮৭১ বাংলাদেশি। ২০২৫ সালের একই সময়ে বিদেশ গিয়েছিলেন ছয় লাখ ৯০ হাজার ৮০৪ জন। অর্থাৎ, ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে বৈদেশিক কর্মসংস্থান।

২০২৪ সালের ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশ গিয়েছিলেন পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৯৪৩ জন। করোনা মহামারির পর চলতি বছরই সর্বনিম্ন বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। সরকারি সংস্থা জনশক্তি কর্মসংস্থান এবং প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) পরিসংখ্যান থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে হামলা চালানোয় বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান আরও ঝুঁকিতে পড়েছে। গত দুই দিনে সৌদিতে অন্তত চার বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন হুতিদের হামলায়। হুতিদের দমনে সৌদি আরব ২০১৪ সাল থেকে ইয়েমেনে হামলা চালাচ্ছে। এতদিন যুদ্ধ ইয়েমেনে সীমাবদ্ধ ছিল। ইরানসমর্থিত হুতিরা গত মাসে সৌদিতে পাল্টা হামলা শুরু করে। দেশটির তেল খনি, পাইপলাইন, বিমানঘাঁটি এবং বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলা হয়েছে। যুদ্ধ সৌদিতে ছড়ানোর কারণে দেশটির অর্থনীতিতে ক্ষতি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব। চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত দুই লাখ এক হাজার ৩৬১ বাংলাদেশি কর্মী সৌদি গেছেন। গত বছরের ১ মার্চ থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল চার লাখ ৫০ হাজার ৯০৭। অর্থাৎ, সৌদিতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান ৫৫ শতাংশ কমেছে।

যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব কর্মসংস্থানে

চলতি বছরের জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে এক লাখ ৬০ হাজার ২৭৬ বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে যান। ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসে এই সংখ্যা ছিল এক লাখ ২৯১। ২০২৪ সালের জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারি মাসে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সংখ্যা এক লাখ ৬১ হাজার ৬৮০। টানা তিন বছর মাসে গড়ে প্রায় ৮০ হাজার বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশ গেছেন। অর্থাৎ, স্থিতিশীল ছিল কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান।

২০২৪ সালের পর মালয়েশিয়া, ওমান, মালদ্বীপের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওপর ভর করে স্থিতিশীল ছিল বাংলাদেশিদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশ গিয়েছিলেন। তিনটি বড় শ্রমবাজার বন্ধ হওয়ার পরও ২০২৫ সালে জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছিল এক লাখ ২২ হাজার। কারণ, সৌদি আরবে গত বছর কর্মসংস্থান হয় সাত লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ বাংলাদেশির।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর এই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। চলতি বছরের ১০ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশ গেছেন পাঁচ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৭ জন। আগের বছরে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত গিয়েছিলেন আট লাখ ৫১ হাজার ৯৫ জন। অর্থাৎ, এই বছরে সার্বিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমেছে ৩২ শতাংশ।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলার পর যুদ্ধ ছড়িয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক ও জর্ডানে। এসব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা করে ইরান। পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে অস্থিরতা ছড়ায়। এই অঞ্চলে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ হয়ে থাকে।

প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর সমকালকে বলেছেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের আগের পরিসংখ্যানের ওপর ভর করেই পাঁচ বছরে এক কোটি চাকরির সুযোগ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিএনপি জোট। কিন্তু সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। এই অঞ্চলে বাংলাদেশের বার্ষিক বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশ হয়ে থাকে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে কমছে কর্মসংস্থান

সংযুক্ত আরব আমিরাত ছাড়া সব দেশেই কর্মসংস্থান কমেছে যুদ্ধের পর। আমিরাতে এ বছরের ১ মার্চ থেকে ১৯ হাজার ৮৭৪ কর্মী গেছেন। গত বছরে এই সংখ্যা ছিল আট হাজার ৭৩১। অথচ একসময় দেশটিতে বছরে দুই লাখের বেশি বাংলাদেশির কর্মসংস্থানের নজির রয়েছে।

জালজালিয়াতির অভিযোগে ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে আমিরাত। গত বছর দেশটিতে সফরে গিয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস শ্রমবাজার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। পরে তিনি দেশটিতে থাকা বাংলাদেশিদের নিয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, জাল নথি, ভুয়া অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সনদে বিদেশ যাওয়ায় বাংলাদেশিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিদেশ গিয়ে মাথা হেঁট হয়।

আমিরাত থেকে ছুটিতে দেশে আসা বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা বাতিলের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এই সংখ্যা গত কয়েক মাসে তিন হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানা গেছে। কী কারণে ভিসা বাতিল করা হচ্ছে, তা জানায়নি আমিরাত। চলতি মাসেই এই কর্মীরা ঢাকায় বিক্ষোভ করেছেন। প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক বলেছেন, আমিরাতে শ্রমবাজার পুরোপুরি খোলার চেষ্টা চলছে। ২০২৩ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে ওমানের শ্রমবাজার। এই শ্রমবাজার খোলার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

কুয়েতে এ বছরের ১ মার্চ থেকে বাংলাদেশি কর্মী গিয়েছেন ১৯ হাজার ৩৮৬ জন। আগের বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ৫৬০। কাতারে এ বছরের ১ মার্চ থেকে কর্মী গিয়েছেন ৪১ হাজার ৫৭২ জন। আগের বছরে এই সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৩৪১। জর্ডানে এ বছর কর্মী গিয়েছেন ৯ হাজার ১৪৬ জন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল সাত হাজার ৩২২। ইরাকে এ বছর দুই হাজার ৫৭৫ এবং গত বছর তিন হাজার ৯৮ কর্মী গেছেন।

অন্যান্য বাজারেও সুখবর নেই

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, অন্যতম বড় শ্রমবাজার সিঙ্গাপুরেও কর্মী পাঠানো কমেছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা এলেও এখনও কর্মী পাঠানো শুরু হয়নি। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি নেই জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শ্রমবাজারে। কর্মী পাঠানোয় সমঝোতা স্মারক সই হলেও অস্ট্রেলিয়া, গ্রিসের মতো দেশগুলোর শ্রমবাজার খোলেনি।

এ ছাড়া রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ডসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে শ্রমবাজার বন্ধ রয়েছে। এসব দেশের ভিসা পেতে ভারতের নয়াদিল্লিতে দূতাবাসে যেতে হয় বাংলাদেশিদের। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় দিল্লি যেতে পারছেন না কর্মীরা। আবার ইউরোপের এই দেশগুলোতে গিয়ে কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে নিয়োগকারীরা।

ইউরোপের দেশে প্রবেশের পথ হয়ে ওঠায় কিরগিজস্তানের শ্রমবাজারও বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় বন্ধের পথে। বৈধ চাকরি দেখিয়ে রাশিয়ায় পাঠিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ায় দেশটির শ্রমবাজারও নিরাপদ নয়। ২০২৪ সালের মে মাসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের পর সিঙ্গাপুরই মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সবচেয়ে বড় ভরসা। গত বছর ৭০ হাজার ৮৩৫ বাংলাদেশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। চলতি বছরের ৯ মাসে এই সংখ্যা ৬১ হাজার ১৮। অর্থাৎ এই শ্রমবাজার আমাদের জন্য প্রসারিত হয়নি।

উচ্চ বেতন এবং ভালো কর্মপরিবেশের জন্য খ্যাতি রয়েছে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার। এই দুই দেশেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি হচ্ছে না। চলতি বছর জাপান গেছেন এক হাজার ৭১০ জন। দক্ষিণ কোরিয়ায় গেছেন এক হাজার ২১০ জন।

নিম্ন জন্মহারের কারণে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় জনসংখ্যা কমছে। কর্মীর ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই সুযোগ নেওয়ার কথা বলছে। জাপানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। এক লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। চলতি মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান যাচ্ছেন। তাঁর সফরেও জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
নুরুল হক নুর সমকালকে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিষয়টি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। সরকার জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপের মলদোভা, পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড, এমনকি আফ্রিকার দেশগুলোতেও বৈদেশিক কর্মসংস্থার সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, শুধু যুদ্ধ নয়, কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আরও কিছু কারণ রয়েছে। সৌদি আরবে যেতে এখন ‘তাকামুল’ নামে পরীক্ষা দিতে হয়। এতে পাস করতে না পারলে ভিসা দেওয়া হয় না। আবার সৌদিতে গিয়ে চাকরি, কাজ, বেতন না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাই ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোর দিকে নজর দিতে হবে সরকারকে। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে হবে। জনশক্তি ব্যবসায়ীরা এসব দেশে কাজ করার সুযোগ পেলে শ্রমবাজার তৈরি করা সম্ভব।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD