মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত এবার বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক মহাবিপদ সংকেত নিয়ে এসেছে। তেহরান কর্তৃক কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ ঘোষণা এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে নৌ অবরোধ আরোপের পর, এবার আরও কঠোর হুঁশিয়ারি দিল ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য লাভজনক বিশ্বের অন্য সব রপ্তানি করিডোরও বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে আইআরজিসি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ বুধবার আইআরজিসি-এর একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নৌ অবরোধের কারণে ‘আমেরিকার অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী’ সহ সারা বিশ্বে তেল ও গ্যাস রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে। এর জবাবে সতর্কবার্তা দিয়ে আইআরজিসি স্পষ্ট জানিয়েছে—
‘আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানি হয় সকলের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া হবে, অথবা সকলের জন্য তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। আমেরিকার অপকর্মের অবসান না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে।’
শান্তিকালীন সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) পরিবহনের জন্য হরমুজ প্রণালী ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এই প্রণালীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এটি ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধের এক নতুন উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই অচলাবস্থার কারণে ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী হু হু করে বাড়ছে জ্বালানি তেলের দাম।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান শুধু হরমুজ প্রণালী বন্ধ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না; তারা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ব্যবহার করে লোহিত সাগরের প্রবেশপথ ‘বাব-এল-মানদেব’ বন্ধ করে দেওয়ারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি এমনটা ঘটে, তবে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে একটি নতুন ফ্রন্ট তৈরি হবে এবং বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি ধমনী একসাথে ঝুঁকির মুখে পড়বে।
উল্লেখ্য, বাব-এল-মানদেব প্রণালীটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সাথে যুক্ত করেছে, যা সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং বিশ্বব্যাপী নৌপরিবহণের একটি অন্যতম প্রধান রুট। এর আগে ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে হুথিরা এই রুটে ইসরায়েল ও তার মিত্রদের জাহাজে হামলা চালিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যকে কার্যত স্থবির করে দিয়েছিল।
বিশ্বব্যাপী নৌপরিবহনের ওপর ইরানের এই সর্বশেষ হুমকিটি এসেছে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এক পাক্ষিক ঘোষণার পরপরই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গত সপ্তাহে ইরান সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত, নিখোঁজ বা আহত হয়েছেন।
এর জবাবে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ‘হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ হামলায় ব্যবহৃত ইরানি সক্ষমতা হ্রাস করতে’ তারা নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। মঙ্গলবার গভীর রাতে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালী এবং ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলের কাছে কয়েক ডজন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে টানা সাত ঘণ্টা ধরে ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
সব মিলিয়ে, পাল্টাপাল্টি অবরোধ ও হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন এক অনিয়ন্ত্রিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের দিকে মোড় নিচ্ছে। ডন