১৯৬০ সালে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্সে’ মানবসভ্যতা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিলÑ ১৩ নভেম্বর ২০২৬ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় অসীম পর্যায়ে পৌঁছে মানবসভ্যতা ধ্বংসের মুখে পড়বে। গবেষণাটির লেখক ছিলেন অস্ট্রীয়-আমেরিকান সাইবারনেটিকস বিশেষজ্ঞ হেইঞ্জ ফন ফোয়েস্টার এবং তার দুই শিক্ষার্থী প্যাট্রিসিয়া এম. মোরা ও লরেন্স ডব্লিউ. অ্যামিয়ট।
গবেষকদের হিসাব ছিল, মানুষের জনসংখ্যা সাধারণ হারে নয়, বরং ক্রমবর্ধমান গতিতে বাড়ছে। ইতিহাসের প্রায় ২ হাজার বছরের জনসংখ্যার ২৪টি হিসাব বিশ্লেষণ করে তারা দাবি করেন, মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে প্রচলিত পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। সেই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে জনসংখ্যা ‘অসীমের কাছাকাছি’ চলে যাবে বলে তারা ধারণা করেন। তাদের ভাষায়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনাহারে নয়, বরং অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে ‘চাপা পড়ে’ মারা যেতে পারে।
তবে গবেষণাপত্রটি শুধু সমালোচিত হয়নি; বরং কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ১৯৬০-এর দশক থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত জনসংখ্যাবিদ্যা, পরিবেশবিদ্যা ও জেনেটিকসের বিভিন্ন বইয়ে ‘ডুমসডে’ সমীকরণটি উদ্ধৃত হয়। এমনকি কানাডার একটি সংসদীয় কমিটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ গর্ভপাত মামলায়ও এর উল্লেখ পাওয়া যায়।
মজার বিষয় হলো, গবেষণাটির জনসংখ্যাসংক্রান্ত পূর্বাভাস কয়েক দশক পর্যন্ত বেশ নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বিশ্ব জনসংখ্যা তাদের পূর্বাভাসের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়তে শুরু করে। এর অন্যতম কারণ ছিল জন্মহার কমে যাওয়া। বর্তমানে বিশ্বে জন্মহার ১৯৬০ সালের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
ফলে ১৩ নভেম্বর ২০২৬-এ ‘ডুমসডে’ বা মানবসভ্যতার অবসান ঘটার আশঙ্কার বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং এই গবেষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—বৈজ্ঞানিক তথ্যকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়, সেটিও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ।
ফন ফোয়েস্টার একসময় মঞ্চের জাদুকরও ছিলেন। তার গবেষণাপত্রের অসাধারণ শিরোনাম ও চমকপ্রদ উপসংহার সাধারণ বৈজ্ঞানিক আলোচনাকে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। বিজ্ঞান, তথ্য ও উপস্থাপনার এই সমন্বয়ই ‘ডুমসডে’ গবেষণাকে আজও স্মরণীয় করে রেখেছে।
সূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট