গ্যাস সংকট সাময়িক—আগামী পাঁচ থেকে সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাগরে আমদানি করা গ্যাস সংরক্ষণের দুটি জাহাজের একটিতে আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর সরবরাহ ব্যবস্থায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। গত সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে।
একই সঙ্গে গ্যাস, তেল ও বিদ্যুৎ নিয়ে অবৈধ কারবারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ, একটি অসাধু চক্র মেশিন দিয়ে জোর করে পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস নিয়ে নিজেদের লাভবান করছে। এতে একজন লাভবান হলেও কষ্টে পড়ছেন অন্য ১০ জন। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকার একা পারবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে ঢাকা-১৭ আসনের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মন্দিরে আর্থিক অনুদান দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে দলের স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জ্বালানি সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করে তারেক রহমান বলেন, বিদেশ থেকে আমদানি করা গ্যাস এনে রাখার জন্য সাগরে দুটি জাহাজ রয়েছে। এসব জাহাজের মালিকানা বিদেশি কোম্পানির। এর মধ্যে একটি জাহাজে আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কী কারণে আগুন লেগেছে, তা এখনো জানা যায়নি। ফলে অপর জাহাজটির ওপর চাপ পড়েছে এবং পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ গত সপ্তাহ থেকে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। আস্তে আস্তে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। হয়ত আরও ৫-৭ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে ইনশাআল্লাহ।’
তবে গ্যাস সংকটের পাশাপাশি অবৈধভাবে গ্যাস উত্তোলনের বিষয়টি নিয়েও সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তেলের মতো গ্যাসের ক্ষেত্রেও একটি অসাধু চক্র তৈরি হয়েছে। তারা একটি মেশিন দিয়ে জোর করে পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস নিয়ে যাচ্ছে। তারা নিজেরা লাভবান হলেও অন্য দশজনকে কষ্টে ফেলছে। এসব বন্ধ করতে হবে। কেউ অবৈধভাবে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও তেল নিয়ে গেলে সবাইকে তা প্রতিরোধ করার আহ্বান জানান তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেও জ্বালানি সংকট
চলমান বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের বহু দেশের সমস্যা বলে মন্তব্য করেন তারেক রহমান। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এর প্রভাব পড়ছে। বিএনপি সরকার গঠনের ১২ দিন পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার শুরুতে জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে কীভাবে জনগণকে স্বস্তি দেওয়া যায়, সেই চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন দেশের তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে প্রথমে দাম বাড়ানো হয়নি। কিন্তু কিছু অসাধু মানুষ তেলের ব্যবহার এমনভাবে শুরু করায় সরকার বাধ্য হয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছে।
বিদেশ নির্ভরতা কাটাতে বাপেক্স
দেশে গ্যাস থাকতে পারে—কিন্তু কোথায় কী পরিমাণ গ্যাস রয়েছে, তার প্রকৃত অবস্থা এখনো জানা নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার অভিযোগ, গত ১৭ বছর স্বৈরাচারী সরকার দেশের জ্বালানি খাতকে এমনভাবে বিদেশ-নির্ভর করে তুলেছিল যে দেশীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিভিন্নভাবে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে পুরোপুরি বিদেশ-নির্ভর করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর বর্তমান সরকার বাপেক্সকে সক্রিয় করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। তবে গ্যাস অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সরকার ১৩০টি গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে। গ্যাস পাওয়া গেলে জ্বালানি সংকটেরও উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জনগণের সম্পদ জনগণের জন্য
বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের মূল লক্ষ্য মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তৃণমূল ও সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষ ভোট দিয়ে বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন।
বিগত এক যুগেরও বেশি সময় স্বৈরাচার বা ফ্যাসিস্টের অধীনে দেশ ছিল দাবি করে তিনি বলেন, অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে মানুষের ভোট ও কথা বলার অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল। দেশের মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিজেদের স্বার্থে ব্যয় ও বিদেশে পাচারের বিষয়টি মানুষ দেখেছে ও জেনেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রকাশিত শ্বেতপত্রের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচারের কথা বলা হয়েছে। এই অর্থ ও সম্পদ দেশের মানুষের। সরকার গঠনের পর থেকেই এসব সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে জনগণের জন্য ব্যয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
নারী ও কৃষকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন
দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনার সময় নারীদের স্বাবলম্বী করতে ডিগ্রি পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি করে দিয়েছিলেন। বর্তমান সরকার নারীদের অনার্স পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ঢাকা-১৭ আসনে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, নভেম্বর বা ডিসেম্বর থেকে ৪১ লাখ নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। সরকারের লক্ষ্য একটি শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী জাতি গড়ে তোলা।
ধর্মের কারণে সরকারের কাছে কোনো ভেদাভেদ নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারাদেশের ধর্মগুরুদের সহায়তার প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড দেওয়ার ওয়াদা করা হয়েছিল। কৃষকের ১০ হাজার টাকার কৃষি ঋণ মওকুফ করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রত্যেকটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, জনগণ বিএনপিকে নির্বাচিত করেছে। তাই সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা যতটুকু সম্ভব পূরণ করা। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। তবে যেকোনো কর্মসূচি বাস্তবায়নে সময় লাগে।