দুই বছর পর আবার পুরনো রূপ ফিরে পেয়েছে বিয়েবাড়ি। জাঁকজমক, রং খেলা, বর-কনের অভিজাত সাজ, দল বেঁধে ভোজন—সব কিছুতেই ফিরেছে প্রাণ। এখনকার বিয়ের আয়োজন, বর-কনের সাজ, অতিথিদের আপ্যায়নসহ নানা বিষয় নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আতিফ আতাউর।
কী পরল বর-কনে
বিয়ের সবচেয়ে ব্যস্ত অতিথি যিনি, তিনিও চান একনজর বর-কনের দেখা। কারণ বিয়ের কেন্দ্রবিন্দুই তো তারা। এ জন্য বর-কনের সাজ নিয়ে সবার আগ্রহেরও যেন শেষ থাকে না। আবহমান কাল থেকে বিয়েতে বরের পছন্দ শেরোয়ানি, কনের শাড়ি। এই ধারা চলছে এখনো। বেনারসি তো থাকছেই, সঙ্গে কাতান, জামদানি, মসলিনও পরছেন কেউ কেউ। বিয়ের বেনারসি, জামদানি, মসলিনগুলোতে ডিজাইনাররা বাড়তি মনোযোগ দিয়ে থাকেন। এ জন্য এসব শাড়ির বুনন, নকশা ও কারুকাজ নজর কাড়ে সহজেই। এসব শাড়িতে মুক্তা, পাথর, জরির কাজ ও বাড়তি ওড়না যোগ করছে ভিন্ন মাত্রা। যারা স্বদেশি ভাবনা সামনে রেখে বিয়ের সাজে সাজতে চান তারা বেছে নেন দেশি তাতে বোনা, হাতে কাজ করা শাড়ি। টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের স্বত্বাধিকারী মুনিরা এমদাদ বলেন, ‘এখন দেশি শাড়িতেও অনেক নারী বউ সাজতে পছন্দ করেন। আমাদের শোরুমগুলোতে প্রতিনিয়ত বিয়ের শাড়ি কিনতে আসা কনেরা এমন আগ্রহের কথা জানান। তাদের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন নতুন নকশার এক্সক্লুসিভ বিয়ের শাড়ি নিয়ে আসছি আমরা।’ শুধু কেনা শাড়ি নয়, এখন মনের মতো ডিজাইন জমা দিয়ে শাড়ি বানিয়েও নিচ্ছেন অনেক কনে। ডিজাইনার স্বত্বাধিকারী সৌমিক দাস ও ফোয়ারা ফেরদৌস দিলেন এমন তথ্য। তাঁরা বলেন, ‘অনেকেই নিজেদের মতো করে বিয়ের পুরো আয়োজন সাজান। সেখানে বর-কনে কেমন পোশাকে সাজবেন—সে রকম পরিকল্পনাও করা থাকে। আবার ওয়েডিং প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন নতুন আইডিয়া উপস্থাপন করে বর-কনের কাছে। এরপর তারা নিজেরাই হয়তো শাড়ি, শেরোয়ানির ডিজাইন করেন বা সংগ্রহ করেন। এরপর তাঁদের চাহিদামতো সেই ডিজাইনের শাড়ি, শেরোয়ানি আমরা তৈরি করে দিই।’
শুধু শাড়ি আর শেরোয়ানি নয়, এখনকার বিয়েতে কনেদের ট্রেন্ড গাউন বা লেহেঙ্গার মতো পোশাক। ভারী পাথর, জরি ও চুমকির কাজ করা এসব গাউন ও লেহেঙ্গা বেশ কয়েক বছর ধরেই বাঙালি বিয়েতে নতুন পালক তুলেছে। দেশেই এখন তৈরি হচ্ছে এমন বর্ণিল পোশাক। লাল, নীল, হলুদ, আকাশি নানা রঙের লেহেঙ্গাতেও এখন বিয়ের আসর মাতাচ্ছেন কনেরা। বর পরছেন এক রঙা স্যুট, প্যান্ট। সঙ্গে থাকছে রঙিন টাই ও রুমাল। মানাচ্ছেও দারুণ।
সাজ ও গয়না
বিয়েতে কনের সাজে সোনার গয়নার প্রচলন বহু পুরনো। এখনো সেই ধারার দারুণ সমাদর। বিয়েতে কনে কত ভরি সোনার গয়না পরল সেটা নিয়ে আলোচনারও কমতি নেই। তবে এখনকার তরুণীরাই তাতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন। বিয়ে মানেই শুধু সোনার গয়নায় সাজ—এই ধারা ভেঙে দিচ্ছেন তারা। বিয়েতে এখন রুপা, কাঠ, কড়ি, শামুক, ঝিনুক, মুক্তাসহ বিভিন্ন ধাতুর তৈরি বাহারি গয়নায় সাজছেন কনেরা। আবার কেউ কেউ শুধু ফুলের গয়নাতেই সারছেন বিয়ের কনের সাজ।
বিয়েতে কিছুদিন আগে করোনার মধ্যে হালকা সাজই ছিল এগিয়ে। এবার আবার ভারী ও জমকালো সাজের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন কনেরা। বিয়ের পুরনো চেনা ছন্দ ফিরেছে বলেই এমন সাজের চাহিদা বলে জানালেন রূপ বিশেষজ্ঞরা। কনে সাজে লালের আবেদন চিরন্তন। সঙ্গে লাল চুরি, একটু ভারী মেকআপ ও লাল ওড়নাতেই যেন লাল টুকটুকে রাঙা বউয়ের সাজ পায় পূর্ণতা। লাল শাড়ি ও লাল লিপস্টিকে টুকটুকে লাল ঠোঁট নজর কাড়বেই।
ঘর ও ছাদ ছেড়ে আবার বাইরে
করোনাকালে ঘরের ড্রয়িং কিংবা বাসার ছাদই ছিল বিয়ের আয়োজনের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার বড় ভরসা। করোনা কমে যাওয়ায় এখন চিলেকোঠা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে বিয়ে। আবার বিয়ে ফিরেছে কনভেনশন সেন্টারে। করোনাকালের পারিবারিক পরিমণ্ডলেও আর সীমাবদ্ধ নেই বিয়ে। এখন বড় আয়োজনে হাজারো অতিথি ও আত্মীয়র আগমনে সরগরম হয়ে উঠছে বিয়ের মঞ্চ।
খাবারদাবারেও ফিরেছে পুরনো স্বাদ আর গন্ধ। বিরিয়ানি, পোলাউ, কোরমা, রেজালা, বোরহানিতে মজছেন অতিথিরা। ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার ডেপুটি ব্র্যান্ড ম্যানেজার মেহেদী হাসান মোল্লা জানান, ‘করোনার মধ্যে দীর্ঘদিন সরকারি নির্দেশনা মেনে বন্ধ ছিল কনভেনশন সেন্টার। করোনা কমে যাওয়ায় এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় আবার কনভেনশন সেন্টারে ফিরেছে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। তবে এখনো পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পরিচালিত হচ্ছে বিয়েসহ সব আয়োজন।’
স্মৃতিপটের আয়োজন
বিয়ের স্মৃতিকে অমলিন রাখতে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করার ট্রেন্ড দীর্ঘদিনের। এখন ভিডিওতেও ধারণ করে রাখা হচ্ছে বিয়ের সব আয়োজন। শুধু কী তাই, পুরো আয়োজন ঘিরে চলছে বিয়ের সিনেমা বানানোর যজ্ঞ।
এ জন্য আগে থেকেই ছবি ও ভিডিওর জন্য নেওয়া হচ্ছে নানা প্রস্তুতি। তবে কিছুদিন ধরে তাতে রং লাগিয়েছে প্রি-ওয়েডিং ফটোগ্রাফি বা বিয়ের আগে বিয়ের ছবি। এ জন্য হবু বর-কনে ছুট লাগাচ্ছেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত কোনো স্থানে। আর বিয়ের পর বিয়ের ছবি তোলার আয়োজন তো থাকছেই।
মিনিমাল টোনের সাজে উচ্চকিত চোখ আর ঠোঁট কনেকে আলাদা করে। বরের স্বচ্ছন্দ, চটপটে লুক যেন এই সময়কেই তুলে ধরে। গয়নায় ভারী, হালকা কিংবা দুইয়ের মিশেল, পোশাকে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন, থিম, মোটিফ—এ সবই ট্রেন্ডি। তবে একেবারে যা এ বছরের, তা হলো, ওড়নায় বাংলা গানের কথা।