বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দিন হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এদিন প্রথমবারের মতো একই সঙ্গে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একটি নতুন জাতীয় সনদ অনুমোদনের লক্ষ্যে দেশব্যাপী গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা যাতে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে এরইমধ্যে।
ভোটের সময়সূচি ও প্রাথমিক প্রস্তুতি-
১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ চলবে। ভোটারদের বিভ্রান্তি এড়াতে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগেই নিজের সঠিক কেন্দ্র এবং ভোটার তালিকার ক্রমিক নম্বর জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। এটি ভোটকেন্দ্রে আপনার মূল্যবান সময় বাঁচাবে এবং লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কোনো প্রকার বিভ্রান্তি তৈরি হতে দেবে না।
সহজে তথ্য পাওয়ার ডিজিটাল মাধ্যমসমূহ:
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট তথ্য সহজে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে সক্রিয় করা হয়েছে:
১. স্মার্ট অ্যাপ: গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে ‘Smart Election Management BD’ অ্যাপটি ডাউনলোড করে এনআইডি নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে সহজেই আপনার কেন্দ্র এবং ভোটার নম্বর জানা যাবে।
২. হটলাইন (১০৫) : আপনার এনআইডি ও জন্মতারিখ হাতে নিয়ে ১০৫ নম্বরে কল করুন। অপারেটরের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে ৯ চাপুন।
৩. এসএমএস পদ্ধতি: মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে PC <space> NID Number লিখে ১০৫ নম্বরে পাঠালে ফিরতি মেসেজে আপনার নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রের নাম ও ভোটার তালিকার ক্রমিক নম্বর জানিয়ে দেওয়া হবে।
৪. অফলাইন উপায়: এ ছাড়া আপনার এলাকার উপজেলা বা জেলা নির্বাচন অফিস অথবা সরাসরি ভোটকেন্দ্রে টাঙানো ভোটার তালিকা থেকেও এই তথ্য সংগ্রহ করা যাবে।
ভোটদানের সঠিক ও স্বচ্ছ পদ্ধতি
এবারের নির্বাচন সম্পূর্ণ সনাতন পদ্ধতিতে অর্থাৎ কাগজের ব্যালট ও ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে। ভোটারদের সুবিধার্থে ভোটদানের ধাপগুলো ধাপে ধাপে নিচে দেওয়া হলো:
পরিচয় নিশ্চিতকরণ ও কালি: কেন্দ্রে প্রবেশের পর পোলিং অফিসার আপনার নাম ও ক্রমিক নম্বর মেলাবেন। সব ঠিক থাকলে আপনার বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলে বা অন্য কোনো আঙুলে অমোচনীয় কালির দাগ দেবেন।
ব্যালট পেপার সংগ্রহ: এরপর আপনাকে দুটি পৃথক ব্যালট পেপার দেওয়া হবে—একটি সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীর প্রতীক সংবলিত এবং অন্যটি গণভোটের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ সংবলিত। সংসদ নির্বাচনের ব্যালট পেপার হবে সাদা-কালো রঙের। আর গণভোটের ব্যালট পেপার থাকবে গোলাপি রঙের। ব্যালটের পেছনে অফিশিয়াল সিল ও প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর আছে কি না তা অবশ্যই নিশ্চিত হয়ে নিন।
আরও পড়ুন: সংসদ নির্বাচন ও গণভোট /টানা ছুটি শুরু: বন্ধ অফিস-আদালত, সচল থাকবে যেসব জরুরি সেবা
গোপন কক্ষ ও সিল: ব্যালট পেপার নিয়ে আপনি নির্ধারিত গোপন কক্ষে যাবেন। সংসদ নির্বাচনের ব্যালটে আপনার পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকের ওপর এবং গণভোটের ব্যালটে আপনার পছন্দের উত্তরের ঘরে রাবার স্ট্যাম্প দিয়ে স্পষ্ট করে সিল দেবেন।
ব্যালট ভাঁজ করার কৌশল: সিল দেওয়ার পর ব্যালটটি এমনভাবে লম্বালম্বি বা খাড়াভাবে ভাঁজ করুন যেন সিলের ভেজা কালি অন্য কোনো প্রতীকের ওপর লেগে ভোটটি নষ্ট না হয়।
বাক্সে নিক্ষেপ: ভাঁজ করা ব্যালট স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ফেলুন এবং দ্রুত কেন্দ্র ত্যাগ করুন। গণভোটের জন্য আলাদা কোনো ব্যালট বাক্স থাকবে না। অর্থাৎ একই ব্যালট বাক্সে দুটি ব্যালট ফেলতে হবে।
ভোট কেন বাতিল বা স্থগিত হতে পারে?
ভোটের গ্রহণযোগ্যতা রক্ষায় নির্বাচন কমিশন জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। যেসব কারণে ভোট বাতিল বা স্থগিত হতে পারে:
সহিংসতা ও বাধা: ভোটকেন্দ্র দখল, মারামারি, ককটেল বা বোমা হামলা, গুলিবর্ষণ, ব্যালট ছিনতাই কিংবা ভাঙচুরের মতো সহিংসতার ঘটনা ঘটলে ভোটগ্রহণ অব্যাহত রাখা সম্ভব হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রিসাইডিং অফিসার তাৎক্ষণিকভাবে ভোট স্থগিত করতে পারেন। পরে তদন্ত শেষে অনেক ক্ষেত্রে কমিশন পুনরায় ভোটের সিদ্ধান্ত দেয়।
ব্যালট পেপারে ত্রুটি ও কারচুপি: ব্যালট পেপার নষ্ট বা হারিয়ে গেলে ভোটের সঠিকতা নিশ্চিত করা যায় না। আইন অনুযায়ী, এমন অবস্থায় ওই কেন্দ্রের ফলাফল গ্রহণযোগ্য থাকে না। এ ছাড়া বুথ দখল করে একযোগে জালভোট প্রদান, একজনের একাধিকবার ভোট দেওয়া কিংবা সংঘবদ্ধ কারচুপি ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ নির্বাচনের পরিপন্থী। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে ফলাফল বাতিল করা হয়।
ভীতি প্রদর্শন: ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, কেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া, হুমকি বা জোরপূর্বক ভোটদানে প্রভাব বিস্তার করাও ভোট বাতিলের কারণ হতে পারে। এসব পরিস্থিতি ভোটারদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে এবং ভোটগ্রহণের পরিবেশ নষ্ট করে।
কর্মকর্তাদের গাফিলতি: কখনো কখনো প্রিসাইডিং অফিসার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, ইচ্ছাকৃত ত্রুটি, ফলাফল পরিবর্তন বা নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনাও সামনে আসে। কর্মকর্তার কারচুপি প্রমাণিত হলে সেই কেন্দ্রের ভোট বাতিল হতে পারে।
প্রযুক্তিগত ও কারিগরি ত্রুটি: প্রযুক্তিগত ত্রুটিও একটি বড় কারণ। ব্যালট পেপার ভুল ছাপা, সিল বা সরঞ্জামের সমস্যা, ইভিএম বিকল হওয়া কিংবা ডেটা গরমিলের মতো ঘটনায় ভোট স্থগিত বা বাতিলের নজির রয়েছে।
ভোটারের নিরাপত্তা ঝুঁকি: কোনো এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ভোটার ও কর্মকর্তাদের জীবন-ঝুঁকি তৈরি হয়। এমন অবস্থায় নিরাপত্তার স্বার্থে ভোটগ্রহণ বন্ধ করার ক্ষমতা রয়েছে নির্বাচন কর্মকর্তাদের। এ ছাড়া কোনো প্রার্থীর অভিযোগ বা রিটের ভিত্তিতে আদালত ভোট বা ফলাফল স্থগিতের নির্দেশ দিলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বা আসনের ভোটও বাতিল বা স্থগিত করা হয়।
নির্বাচন ও ভোটার পরিসংখ্যান
সংসদীয় আসন: ২৯৮টি
রাজনৈতিক দল: ৫১ টি।
মোট প্রার্থী: ২ হাজার ৩৪ জন (স্বতন্ত্র ২৭৫ জন)।
মোট ভোটার: ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন।
নারী ও পুরুষ ভোটার: পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ও নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ (তৃতীয় লিঙ্গ ১,২৩২ জন)।
ভোটকেন্দ্র: ৪২ হাজার ৭৭৯ টি।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা: আট লাখের মহড়া
শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সারা দেশে সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ ও আনসারসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৮ লাখের বেশি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও বাড়তি নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের প্রত্যাশা, সাধারণ ভোটাররা কোনো প্রকার উসকানি বা ভয়ভীতিতে কান না দিয়ে সকালেই নিজেদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন।