বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) পরীক্ষা চালিয়েছে রাশিয়া। মঙ্গলবার সারমাত (ন্যাটো কর্তৃক ‘স্যাটান ২’ নামে অভিহিত) ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষা চালানো হয়। চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ৩৫ হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিতে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রটি রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হবে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আইসিবিএম-এর পরীক্ষাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে মস্কোর পক্ষ থেকে কোথায় এবং দিনের ঠিক কোন সময় ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষা চালানো হয়েছে, সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
পুতিন বলেন, রাশিয়া এই বছরের শেষে বিশ্বের ‘সবচেয়ে শক্তিশালী’ পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে। সারমাত ক্ষেপণাস্ত্রটির শক্তি যে কোনো পশ্চিমা সমতুল্য ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে চার গুণেরও বেশি। এর পাল্লা ২১ হাজার ৭৫০ মাইলের (৩৫ হাজার কিলোমিটার) চেয়েও বেশি।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত তার ভাষণে উল্লেখ করা হয়, সারমাত ২০১৮ সালে তার উন্মোচিত ভয়েভোদার মতোই শক্তিশালী। তবে এর লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল আঘাত হানার সক্ষমতা অনেক বেশি। ক্ষেপণাস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ভেদ করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ভয়াবহ হামলা চালাতে সক্ষম।
জানা গেছে, পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী সারমাত ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৪০টি সোভিয়েত-নির্মিত ভয়েভোদা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিস্থাপনের জন্য তৈরি করা হয়েছে। এর উন্নয়ন কাজ ২০১১ সালে শুরু হয়েছিল।
২০২৪ সালে পরীক্ষার সময় ক্ষেপণাস্ত্রটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়েছিল। ফলে উৎক্ষেপণটি ব্যর্থ হয়। সেসময় সিবিএস নিউজ কর্তৃক বিশ্লেষিত একটি স্যাটেলাইট চিত্রে উত্তর রাশিয়ার প্লেসেটস্ক কসমোড্রোমের একটি লঞ্চপ্যাডে একটি বড় গর্ত এবং বিস্ফোরণের ধ্বংসাবশেষ দেখা গিয়েছিল।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মিসাইল ডিফেন্স প্রজেক্ট অনুসারে, সারমাতকে একটি ‘ভারী’ আইসিবিএম হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে এবং এটি ১০ টন পর্যন্ত পেলোড বহন করতে সক্ষম।
রাশিয়ার কাছে কতগুলো পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে
২০০০ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে পুতিন রাশিয়ার পারমাণবিক ত্রয়ীর সোভিয়েত-নির্মিত উপাদানগুলোর আধুনিকীকরণের প্রচেষ্টার তত্ত্বাবধান করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে শত শত নতুন ভূমি-ভিত্তিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন, নতুন পারমাণবিক সাবমেরিন চালু করা এবং পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম বোমারু বিমানগুলোর আধুনিকীকরণ।
রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টার কারণে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অস্ত্রাগারের ব্যয়বহুল আধুনিকীকরণ শুরু করতে বাধ্য হয়েছিল।
এদিকে মস্কোর নতুন অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে আভানগার্ড হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল, যা শব্দের গতির চেয়ে ২৭ গুণ দ্রুত উড়তে সক্ষম। প্রথম যানগুলো ইতোমধ্যেই পরিষেবাতে যুক্ত হয়েছে।
রাশিয়া নতুন পারমাণবিক অস্ত্র বহনে সক্ষম ওরেশনিক মধ্যম-পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রেরও অনুমোদন দিয়েছে। ইউক্রেনে হামলা চালাতে এর প্রচলিত অস্ত্রে সজ্জিত সংস্করণটি দুইবার ব্যবহার করেছে। ওরেশনিকের ৩ হাজার ১০০ মাইল পর্যন্ত পাল্লা এটিকে ইউরোপের যে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম করে তোলে।
পুতিন আরও ঘোষণা করেন, রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত পোসাইডন ডুবো ড্রোন ও ক্ষুদ্র পারমাণবিক চালিত বুরেভেস্টনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নের ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে।
মস্কোর পারমাণবিক অস্ত্র বৃদ্ধির এই প্রচেষ্টার নতুন করে পারমাণবিক হামলার আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। কারণ ইউক্রেনে টানা চার বছর ধরে সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে রুশ বাহিনী। যদিও সম্প্রতি ইউক্রেন যুদ্ধ শেষের দিকে বলে জানিয়েছেন পুতিন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত বজায় রেখেছে ক্রেমলিন। ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টস গত বছর অনুমান করেছিল, রাশিয়ার কাছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০টি ওয়ারহেড রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭০০টিরও বেশি মোতায়েন করা হয়েছে এবং ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।