অবিরাম বোমাবর্ষণে গাজা এখন ধ্বংসপুরী এবং এখানে জনজীবন পুরোপুরি বিধ্বস্ত। ঈদে উত্সবের আমেজ আসে না সেখানে। অবরুদ্ধ গাজাবাসী এবার ঈদুল আজহা উদ্যাপন করছে কোরবানি ও হজ ছাড়া। যুদ্ধের আগে প্রতি বছর গাজার তিন হাজার মানুষ হজের সুযোগ পেত এবং এখানে কোরবানি হতো প্রায় ৫০ হাজার পশু। কিন্তু ইসরাইলি বিধি-নিষেধ ও অবরোধের কারণে বিগত তিন বছর যাবত গাজাবাসী যেমন অংশগ্রহণ নিতে পারছে না হজে, তেমনি তারা পশু কোরবানিও করতে পারছে না।
দক্ষিণ গাজার বাসিন্দা নাজিয়া আবু লিহয়া। যুদ্ধের কারণে তিনি তাঁর স্বামীকে হারিয়েছেন। কিন্তু তিনি শুধু তার স্বামীর মৃত্যুর জন্যই শোক করছেন না, বরং তিনি আক্ষেপ করছেন যুদ্ধ ও সীমান্ত বন্ধ থাকার কারণে স্বামীর মৃত্যুর আগে তারা একসঙ্গে মক্কায় হজ পালন করতে পারেননি বলে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আবার হজে যাওয়ার আশা জেগেছিল। কিন্তু চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকায় সেই আশা পূরণ হচ্ছে না।
নাজিয়ার বয়স ৬৪ বছর। তিনি গাজার খান ইউনুস শহরের একটি তাঁবুতে বসবাস করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধের আগে আমরা হজের জন্য নিবন্ধন করেছিলাম এবং আমাদের নামও নির্বাচিত হয়েছিল। কিন্তু তারপর যুদ্ধ শুরু হলো, আর সেটাই আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াল। আমি আশঙ্কা করি, হজের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমিও তাঁর পেছনে পেছনে চলে যাব। কিন্তু আল্লাহ চাইলে আমরা অবরোধ ও সব বাধা সত্ত্বেও হজ আদায় করতে পারব।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির আওতায় ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল আংশিকভাবে রাফাহ ক্রসিং খুলে দেয়, যা গাজার মানুষের বাইরের বিশ্বের সঙ্গে প্রধান যোগাযোগপথ। তবে প্রতি সপ্তাহে মাত্র কয়েকশ মানুষকে পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই অসুস্থ ব্যক্তি এবং তাদের সঙ্গে থাকা অল্পসংখ্যক সহকারী। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এই বিধিনিষেধ ফিলিস্তিনিদের চলাচল ও ধর্মীয় জীবনের স্বাধীনতা খর্ব করার শামিল।
আবু লিহয়া বলেন, সীমান্ত ক্রসিং কার্যত বন্ধ। হাজিদের সঙ্গে এমন কেন করা হচ্ছে? তারা শুধু হজের ফরজ আদায় করতে চায়, অন্য কিছু নয়। তিনি মোবাইল ফোনে মক্কার হাজিদের ভিডিও দেখতে দেখতে বলেন, এই পবিত্র দিনগুলোতে আমাদেরও সেখানে থাকার কথা ছিল।
গাজায় প্রবেশ ও বের হওয়ার বিষয় তদারককারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা কোগাট জানিয়েছে, রাফাহ চুক্তির আওতায় শুধুমাত্র মানবিক কারণে যাতায়াতের অনুমতি রয়েছে। ভ্রমণকারীদের তালিকা মিসরীয় কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে এবং তা ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থার অনুমোদনের পর কার্যকর হয়। গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানায়, ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র পাঁচ ৩০৪ জন গাজায় প্রবেশ বা গাজা ত্যাগ করতে পেরেছেন, যা প্রত্যাশিত সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
অন্যদিকে গাজার কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজাবাসীরা কোরবানির পশু ছাড়াই ঈদুল আজহা উদযাপন করতে যাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের মতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা সামরিক অভিযানের ফলে গাজার প্রাণিসম্পদ খাত সুপরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে। খামার, পশুশালা, ভেটেরিনারি কেন্দ্র এবং পশুখাদ্যের গুদাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধের আগে ঈদুল আজহার মৌসুমে গাজায় প্রতি বছর ১০ থেকে ২০ হাজার গরু এবং ৩০ থেকে ৪০ হাজার ভেড়া আমদানি করা হতো। যা বর্তমানে শূন্যের কোটায় পৌঁছেছে।
কোগাট জানিয়েছে, তারা মাংস, মুরগি, ডিম ও দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি সহজতর করছে এবং গত এক মাসে প্রায় ৮ হাজার টন এসব পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে, যদিও কোনো জীবিত পশু আনা হয়নি। হামাসের দাবি, মে মাসে এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ত্রাণ আসার কথা ছিল, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মাত্র গাজায় পৌঁছেছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা অবাধ ত্রাণ ও পণ্য প্রবেশের আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
বর্তমানে বাজারগুলো প্রায় খালি এবং যে সামান্য পণ্য পাওয়া যায় তার দাম অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও পণ্যের সংকটের কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ভেঙে পড়েছে। অনেক পরিবার মৌলিক খাদ্য সংগ্রহ করতেও হিমশিম খাচ্ছে। সামগ্রিক মানবিক পরিস্থিতিও অত্যন্ত সংকটাপন্ন। গাজার অধিকাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে অনিরাপদ পরিবেশে বসবাস করছে।
গাজার বহু শিশুর জন্য ঈদ এখন আর নতুন পোশাক, উপহার বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাতের উপলক্ষ নয়। তার পরিবর্তে তারা পানি ও খাদ্যের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ায় আর নিহত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রিয়জনদের অনুপস্থিতি অনুভব করে।