সঠিক কাগজপত্র ও বৈধ ভিসা থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতান। বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল তার।
কিন্তু মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১১ ঘণ্টা ধরে অভিবাসন কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
বিশ্বকাপের মূল পর্বে প্রথম সোমালি রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অপেক্ষায় ছিলেন আরতান।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা পাওয়ার পর সোমবার ম্যাচ অফিশিয়ালদের তালিকা থেকে তাকে সরিয়ে দেয় ফিফা।
আরতানকে ফেরত পাঠানোর কারণ এখনো জানায়নি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জারি করা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা দেশগুলোর একটি সোমালিয়া।
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পর ফিফা জানায়, আরতান এবারের বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
নিউইয়র্ক টাইমসকে আরতান বলেন, ‘আমি খুব, খুব হতাশ। আমি স্রেফ একজন রেফারি, যে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছিল। বিশ্বকাপে আসাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল।’
এক বিবৃতিতে ফিফা জানায়, ‘ফিফা নিশ্চিত করছে, ম্যাচ অফিশিয়াল ওমর আবদুলকাদির আরতান যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে অনুমতি না পাওয়ায় ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এ প্রশিক্ষণ নিতে ও দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘আয়োজক দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়া, ভিসা অনুমোদনসহ এসব বিষয়ে ফিফা জড়িত নয়। কর্তৃপক্ষ ফিফাকে জানিয়েছে, আপাতত মি. আরতানের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না।’
সোমালিয়ার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা বিবিসিকে আরতানের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আরতান বৈধ কাগজপত্র নিয়েই ভ্রমণ করছিলেন।
নাইরোবিতে সোমালি দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, এর আগে ভিসা জটিলতার কারণে আরতানের ভ্রমণ সহজ করতে বিশেষভাবে তাকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছিল।
আরতান বলেন, ‘আমার সঠিক কাগজপত্র ছিল, সবকিছুই ছিল। আমার সঠিক ভিসা ছিল।’
১১ ঘণ্টার অভিবাসন জিজ্ঞাসাবাদের পর আরতান জানান, তাকে আলাদা একটি হোল্ডিং সেলে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখার পর তুরস্কের ইস্তাম্বুলগামী ফ্লাইটে তুলে দেওয়া হয় তাকে।
বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে হোয়াইট হাউস টাস্ক ফোর্স অন দ্য ওয়ার্ল্ড কাপের প্রধান অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি বলেন, ‘এ বিষয়ে বিস্তারিত নেতিবাচক তথ্যের মধ্যে আমি যেতে পারব না। তবে বলতে পারি, কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্যাট্রোল সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আমি সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করি।’
আরতানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থেকে শুধু কানাডা বা মেক্সিকোর ম্যাচে দায়িত্ব পালন করাও সম্ভব নয়। কারণ বিশ্বকাপের ৫২ জন রেফারি ও ৮৮ জন সহকারী রেফারির জন্য মায়ামিতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেছেন রেফারিদের প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা।
মাঠের সব অফিশিয়ালকে প্রশিক্ষণ, প্রস্তুতি ও নিরাপত্তার কারণে ফ্লোরিডার ওই ঘাঁটিতেই থাকতে হবে।
গত ডিসেম্বরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সোমালি অভিবাসীদের চান না এবং তাদের ‘যেখান থেকে এসেছে, সেখানে ফিরে যাওয়া’ উচিত।
আরতান বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমার দেশের সঙ্গে তাদের সমস্যা আছে।’
১১ জুন শুরু হয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলবে এবারের বিশ্বকাপ। সোমালি ন্যাশনাল লিগের অফিশিয়াল আরতান ২০১৮ সালে ফিফা রেফারি হন। আফ্রিকা কাপ অব নেশনসেও ম্যাচ পরিচালনা করেছেন তিনি।
আরতানের এই ঘটনা বিশ্বকাপ ঘিরে তৈরি হওয়া একের পর এক বিতর্কের সর্বশেষ সংযোজন। মঙ্গলবার ইরান ফুটবল ফেডারেশন জানায়, গ্রুপ পর্বে তাদের সমর্থকদের জন্য বরাদ্দ টিকিট বাতিল করা হয়েছে।
ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ও বিশ্লেষক ইয়ান রাইট এবারের বিশ্বকাপকে ‘বিশৃঙ্খলার বিশ্বকাপ’ বলে মন্তব্য করেছেন। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘প্রতি কয়েক ঘণ্টা পরপর আরেকটা গল্প আসছে..সমর্থককে বাধা দেওয়া হচ্ছে, খেলোয়াড়কে বাধা দেওয়া হচ্ছে, অফিশিয়ালকে বাধা দেওয়া হচ্ছে, সাংবাদিককে বাধা দেওয়া হচ্ছে, এখন রেফারি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি হাসছি, কিন্তু এটা মোটেও হাসির বিষয় নয়। সত্যিই হাসির বিষয় নয় এবং এ নিয়ে কিছু বলা দরকার। ইতিহাসের সবচেয়ে দামি টিকিট, ব্যয়বহুল আবাসন, পরিবহন খরচ আকাশছোঁয়া।’
আয়োজকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রাইট। তার ভাষায়, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় খেলা, সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্টের আয়োজকরা কি এভাবেই আচরণ করে? আমরা কি আরও কিছু শুনছি না? কাতারকে যেভাবে টেনে নামানো হয়েছিল, এখানে কি তেমন কিছু শুনছি না? সত্যিই কি এটাই ফুটবলের চেতনা?’
আমেরিকান ফুটবলপ্রেমীদের জন্যও বিষয়টি বিব্রতকর বলে মনে করেন রাইট। তিনি বলেন, ‘আমি সেই আমেরিকান সমর্থকদের জন্য খারাপ অনুভব করছি, যারা এই বিশ্বকাপের জন্য মুখিয়ে আছে। তাদের জন্য এটা কতটা বিব্রতকর হতে পারে!’
শেষে তিনি বলেন, ‘এটা একটা বিশৃঙ্খলার বিশ্বকাপ।’