ইরানের বিরুদ্ধে আবারও পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করা হবে কি না, তা নিয়ে গত কয়েক দিনে একাধিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে এসব আলোচনায় ইরানে নতুন করে বড় আকারের হামলার সম্ভাবনা উঠে এসেছে। তবে আপাতত সামরিক অভিযান শুরু না করে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা এ সম্ভাবনাকে ‘কাজ শেষ করা’ হিসেবে দেখলেও ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। সহযোগীদের কাছে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, নতুন করে হামলা শুরু হলে চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ভেঙে যেতে পারে, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিষ্ক্রিয় করার দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, পারমাণবিক সমঝোতার জন্য নির্ধারিত ১৮ আগস্টের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও তার আপত্তি নেই।
অন্যদিকে, ইরান সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করলে সীমিত আকারে এককালীন হামলার নীতিতেই আপাতত সন্তুষ্ট রয়েছেন ট্রাম্প। তবে সাম্প্রতিক আলোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে, তিনি তেহরানের সঙ্গে অচলাবস্থা ভাঙার নতুন উপায় খুঁজছেন এবং সামরিক পথ পুরোপুরি বাতিল করেননি। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প সবসময় কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেন।
গত মঙ্গলবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, প্রেসিডেন্ট প্রশাসনকে আলোচনার ফল দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে কূটনৈতিক সমাধান ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে একাধিক বিকল্প রয়েছে। একই দিনে ট্রাম্পের ইরানবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার নতুন দফার আলোচনার জন্য কাতারের দোহায় পৌঁছান। কাতার কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এ আলোচনা হয়েছে।
বর্তমান আলোচনার বড় জটগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। ইরান দাবি করছে, এ জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে কয়েক বিলিয়ন ডলার সেবা ফি দিতে হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যুদ্ধের আগে যেমন ছিল, তেমনি এ পথ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত। একই সঙ্গে তেহরান জানিয়েছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা তারা মেনে নেবে না। মঙ্গলবার মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট বলেন, ইরান সহযোগিতা করুক বা না করুক, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে যুক্তরাষ্ট্র।
কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ট্রাম্প বিকল্প পরিকল্পনাও খতিয়ে দেখছেন। প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা তাকে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে নতুন করে বড় পরিসরের বিমান হামলার অপারেশন এপিক ফিউরির মতো পরিকল্পনা দেখিয়েছেন। ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইরান বিশেষজ্ঞ সুজান ম্যালোনি বলেন, ট্রাম্প আবার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফিরতে অনিচ্ছুক বলেই মনে হচ্ছে। তবে পূর্বানুমানযোগ্য মার্কিন প্রতিক্রিয়া এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনার সমন্বয় তেহরানকে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে উৎসাহিত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যেও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, প্রয়োজন মনে করলে ইসরায়েল আবারও ইরানে হামলা চালাতে পারে। তিনি বলেন, আমরা ইরানে দুইবার আগাম ও প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছি এবং প্রয়োজন হলে তৃতীয়বারও আঘাত করব। কাটজ আরও বলেন, ইসরায়েলি বাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য লেবানন, সিরিয়া এবং গাজা দখল করে রাখবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে হত্যা করা হতে পারে—কাটজের এমন মন্তব্যের পর তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বলেন, ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো সবার কাছে পরিষ্কার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আমেরিকার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, তেল আবিবের মতো পোষা প্রাণীদের তারা নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। তারা যদি তাদের মালিকের কথা অমান্য করে, তবে ইরান তাদের উচিত শিক্ষা দেবে।
আরাগচি সতর্ক করে বলেন, তাদের জনগণ এবং নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যে কোনো ধরনের হুমকির তাৎক্ষণিক ও শক্তিশালী জবাব দেওয়া হবে।