লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা ও নজিরবিহীন উপস্থিতির মধ্য দিয়ে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল রোববার সকালে দেশটির রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় তিন ধাপে এ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জানাজায় অংশ নেওয়া ৭০টির বেশি দেশের প্রতিনিধি ও বিশ্বস্ত আরব ভাইদের উপস্থিতির জন্য ধন্যবাদ জানান ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
জানাজায় আগত লাখো জনতা এ সময় লাল পতাকা উড়িয়ে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার শপথ নেন। তারা ঘোষণা দেন, খামেনির হত্যাকাণ্ডকে কোনোভাবেই ‘জবাবহীন’ ছেড়ে দেওয়া হবে না। এ ছাড়া গ্র্যান্ড মোসাল্লার বিভিন্ন পোস্টার ও দেয়ালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোলান্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘হত্যার’ দাবি জানানো হয়।
ঐতিহাসিকভাবে লাল ব্যানার বা পতাকা দিয়ে বোঝানো হয়, নির্দোষ মানুষের রক্ত অন্যায়ভাবে ঝরানো হয়েছে এবং এর বিচার এখনো বাকি আছে। সাধারণত মহররমের শোক অনুষ্ঠানের সময় শিয়া মুসলমানরা এ পতাকা দেখান।
গতকাল স্থানীয় সময় ভোর থেকে ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা ও এর চারপাশের সড়কগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে জনসমুদ্রে পরিণত হয়। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় জানাজার কয়েক ঘণ্টা আগেই মসজিদ কমপ্লেক্সের সবকটি ফটক বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পার্সটুডে ও তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, স্থানীয় সকাল ৮টায় (বাংলাদেশ সময় সাড়ে ১০টা) দেশের অন্যতম জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানির ইমামতিতে তিন ধাপে জানাজা সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, দ্বিতীয় ধাপে তার মেয়ে সাইয়্যেদা বুশরা হোসেইনি খামেনি, জামাতা মেসবাহ-উল-হুদা বাকেরি ও পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং শেষ ধাপে খামেনির ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, বিচার বিভাগের প্রধান গোলামহোসেইন মোহসেনি ইজেই এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানিসহ সরকারের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া খামেনির তিন ছেলে মোস্তফা, মাসুদ ও মাইসাম উপস্থিত থাকলেও অসুস্থতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণে বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা আলি খামেনি বাবার জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। জানাজা উপলক্ষে গতকাল ইরানে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
জানাজার নামাজের আগে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করার সময় কবি মোহাম্মদ রাসুলি লাউড স্পিকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করেন, দুনিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্টতম মানুষটি কেন এখনো বেঁচে আছে? তার এ প্রশ্নে উপস্থিত লাখো জনতা চিৎকার করে সমর্থন জানান এবং মোসাল্লাজুড়ে ‘আমেরিকা নিপাত যাক ও ইসরায়েল নিপাত যাক’ স্লোগান তোলেন।
এদিকে গ্র্যান্ড মোসাল্লার বিভিন্ন পোস্টার ও দেয়ালে ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার দাবি জানানো হয়। জানাজায় অংশ নেওয়া ৪২ বছর বয়সী নার্স জিবা নাদেরি বলেন, আমি প্রতিশোধের ডাক শুনেছি। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যে নির্দেশ দেবেন, আমাদের ঠিক তা-ই করতে হবে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের প্রথম দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি সপরিবারে নিহত হন। যুদ্ধ চলতে থাকায় মার্চ মাসে তার শেষকৃত্য স্থগিত করা হয়েছিল। সাত দিনব্যাপী আনুষ্ঠানিক শোক ও দাফন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল সন্ধ্যায় মরদেহ মোসাল্লা থেকে স্থানান্তর করার কথা রয়েছে।
আজ সোমবার রাজধানীজুড়ে প্রধান শোকমিছিল হবে। এরপর মঙ্গলবার মরদেহ নেওয়া হবে শিয়া ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রধান কেন্দ্র কোম নগরীতে। বুধবার কফিন নিয়ে যাওয়া হবে প্রতিবেশী দেশ ইরাকের নাজাফ ও কারবালা শহরে। সবশেষ আগামী বৃহস্পতিবার খামেনির মরদেহ তার জন্মস্থান উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে ফিরিয়ে এনে হজরত ইমাম রেজার মাজারে দাফন করা হবে।