মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৫১ অপরাহ্ন
জুলাই গণহত্যা

ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জুলাই বিপ্লবে গণহত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল-২।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করে। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাতজনের অর্ধেক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে জুলাই ফাইন্ডেশনের মাধ্যমে জুলাইয়ে শহীদ পরিবার ও আহত পরিবারের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন— কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম সোমবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে ২৯ জনের সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের কথোপকথনের অডিও রেকর্ডও ট্রাইব্যুনালে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কথোপকথনের ফরেনসিক প্রতিবেদন এবং এর সমর্থনে অন্যান্য প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে তারা সক্ষম হয়েছে। আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলে আশা করছে রাষ্ট্রপক্ষ।

এর আগে ১৭ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

ওই দিন রাষ্ট্রপক্ষে প্রথমে আইনগত যুক্তি উপস্থাপন করেন সিনিয়র প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলন ঘিরে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা হয়েছিল। মামলায় দাখিল করা বিভিন্ন অডিও-ভিডিওতে এর প্রমাণ রয়েছে। আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ ওবায়দুল কাদের দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। এর ফলে সারা দেশে গুলি চালিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের।

এর জবাবে ওবায়দুল কাদের, নাছিম ও আরাফাতের পক্ষে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী এম হাসান ইমাম বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তার তিন মক্কেল কোনো কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন না। কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ক্ষেত্রে তিনি শুধু শেখ হাসিনাকে দায়ী করেন।

তার দাবি, তার মক্কেলরা কাউকে হত্যা করেননি এবং হত্যার নির্দেশও দেননি।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে যুক্তি খণ্ডন করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে তার চার মক্কেল—সাদ্দাম হোসেন, শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নাম আসেনি।

অন্যরা নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।

অধীনস্থ নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ব্যর্থ হয়েছেন—রাষ্ট্রপক্ষের এমন বক্তব্যও নাকচ করেন ইশরাত জাহান। এ সময় ট্রাইব্যুনাল জানতে চায়, কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না। জবাবে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বিশৃঙ্খলা চলছিল। তাই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।

নারীদের আহত হওয়ার কথা বারবার বলা হলেও এ মামলায় কোনো নারী সাক্ষী আনা হয়নি বলেও যুক্তি দেন এই আইনজীবী। সাক্ষ্যপ্রমাণেও এমন কিছু পাওয়া যায়নি দাবি করে তিনি তার মক্কেলদের খালাস চান।

আসামিপক্ষের যুক্তির জবাবে প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর নীতিতে একই উদ্দেশ্যে একটি গোষ্ঠী অপরাধ করলে সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও ওই গোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্য সমানভাবে দায়ী হন।

তামীমের দাবি, প্রথমে ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে নির্দেশ দেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা হয়। পরে তিনি আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেন। এরপর সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা চালানো হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের এই প্রসিকিউটর আরো বলেন, ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে যুবলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কথোপকথন হয়েছে। এসব কথোপকথন থেকে যুবলীগকে মাঠে থাকার নির্দেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কথোপকথনগুলো ট্রাইব্যুনালে শোনানো হয়েছে। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নিখিলকে মাঠে থেকে হামলার দিকনির্দেশনা দিতে দেখা গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

তামীম বলেন, ব্যাপক হামলা চালালে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হবে—এটি জেনেও ওবায়দুল কাদের হামলার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষ প্রতিটি অভিযোগের পক্ষে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে আসামিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন করেন রাষ্ট্রপক্ষ।

এই মামলাটি প্রথমে ৫/২০২৫ নম্বর মিস কেস হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। গত বছরের ১৮ জুন তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ৭ ডিসেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। এতে আসামিদের বিরুদ্ধে ৯টি অভিযোগ আনা হয়।

ওই দিনই অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। পরে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।

১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়। একই দিন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে ২৯ জন সাক্ষী উপস্থাপন করে। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় ২ আগস্ট। ৪ আগস্ট যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে শেষ হয় ১৭ আগস্ট। ওই দিনই মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD