পুলিশের মাদক সম্পৃক্ততার বিষয়টি কড়া নজরদারিতে রয়েছে। ডোপ টেস্টে (মাদক সেবন পরীক্ষা) কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য শনাক্ত হলেই তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হবে বলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, মাদকে জড়ালে পুলিশকেও ছাড় দেওয়া হবে না। ডোপ টেস্টের আওতায় আনা হচ্ছে মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের।
পুলিশের কিছু সদস্যের মাদক সেবনের বিষয়টি পুরনো। সম্প্রতি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ডোপ টেস্টের ফল পজিটিভ আসায় তা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সব জেলার এসপিদের এ ব্যাপারে বিশেষ নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ভাষ্য, ২০১৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে ১৬৫ জনের বেশি পুলিশ সদস্য বিভাগীয় শাস্তির আওতায় এসেছেন। মাদক সেবনের পাশাপাশি বিভিন্ন সময় চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত সন্দেহভাজন অনেক পুলিশ সদস্য নজরদারির আওতায় এসেছেন। তাঁদের মধ্যে ডোপ টেস্টে মাদকাসক্তির বিষয় শনাক্ত হলেই চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে। গতকাল পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সম্প্রতি ডোপ টেস্টে পুলিশ সুপার (টিআর) আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের মাদকাসক্তি শনাক্ত হওয়ার পর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর জননিরাপত্তা বিভাগের পুলিশ-১ শাখা থেকে এসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
এর পর থেকে অনেক পুলিশ সদস্য আতঙ্কে রয়েছেন বলে সরেজমিনে মাঠ পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পর্যন্ত পদ নন-ক্যাডার হলেও এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিসিএস ক্যাডারভুক্ত।
তবে নন-ক্যাডার থেকে পদোন্নতি পেয়েও কেউ কেউ এএসপি বা অ্যাডিশনাল এসপি হন। এর আগে ডোপ টেস্ট বা মাদক পরীক্ষায় শনাক্ত বা শাস্তি পাওয়া সবাই কনস্টেবল থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার। এই প্রথম এসপি পর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা শনাক্ত হলেন।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। মাদকাসক্তির পরীক্ষায় ধরা পড়ে এর মধ্যে অনেক পুলিশ সদস্য চাকরিচ্যুত হয়েছেন। এই বদনাম ঘোচাতে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে পুলিশ।
মাদকের ভয়াবহতা তুলে ধরে আইজিপি বলেন, একজন সন্তান মাদকাসক্ত হলে শুধু তার নিজের জীবনই নষ্ট হয় না, পুরো পরিবারকে এর খেসারত দিতে হয়।
মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল বলেন, ‘দেড় মাস হলো আমি দায়িত্ব নিয়েছি। এ সময়ের মধ্যে তিনজন পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় তাঁদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। সন্দেহভাজন আরো অনেক পুলিশ সদস্য নজরদারিতে রয়েছেন। তাঁদেরও মাদক পরীক্ষা করা হবে। টেস্টে ধরা পড়লে চাকরিচ্যুত করা হবে।’
ডিএমপিতে ডোপ টেস্টে শনাক্ত বেশি : ডিএমপি সূত্র জানায়, ডিএমপি সদস্যদের মাদকমুক্ত রাখতে ২০২০ সালে শুরু হয় ডোপ টেস্ট শনাক্তকরণ কার্যক্রম। ২০২২ সালের জুলাই পর্যন্ত ১২০ পুলিশ সদস্যের শরীরে মাদকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ জনে। এভাবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৪ জনে। তাঁদের মধ্যে ৯৮ জন কনস্টেবল।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৭ জন পুলিশ সদস্যের ডোপ টেস্টে ফল পজিটিভ এসেছে। তাঁদের মধ্যে ১৫ জন কনস্টেবল, একজন সহকারী উপ-পরিদর্শক ও একজন নায়েক রয়েছেন।
মাদকমুক্ত পুলিশ বাহিনী গড়তে ডোপ টেস্ট : ২০১৮ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পুলিশে ডোপ টেস্ট শুরু করেন মুন্সীগঞ্জের তৎকালীন পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম। এরপর থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী মাদকমুক্ত বাহিনী গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তিন দফায় ডোপ টেস্টের মাধ্যমে পজিটিভ রিপোর্ট এলে মাদক সেবন শনাক্ত হওয়া পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতিসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এভাবে শুরুতে ২৫ জন পুলিশ সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
রাজারবাগ ব্যারাকেও মাদকাসক্ত পুলিশ : পুলিশ জানায়, ২০১৯ সালে রাজারবাগ ব্যারাকে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও মাদক বিক্রির অভিযোগ ওঠে। এরপর সন্দেহভাজন পুলিশ সদস্যদের শনাক্ত করে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে তাঁদের পরীক্ষা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর আগে সাবেক ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে ডিএমপির প্রতিটি বিভাগে চিঠি দিয়ে সন্দেহভাজন মাদকাসক্ত পুলিশ সদস্যদের তালিকা করা হয়।
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল সূত্র জানায়, সন্দেহভাজন পুলিশ সদস্যদের ডোপ টেস্টের আগে প্রথমে সন্দেহভাজনদের স্যাম্পল কালেকশন করা হয়। পরে সেই স্যাম্পল ডোপ টেস্ট মেশিনে দেওয়া হয়। এরপর ওই মাদক ব্যক্তি মাদকাসক্ত কি না, তা ধরা পড়ে। এভাবে বিভিন্ন সময়ে এই হাসপাতালে আড়াই হাজারের বেশি পুলিশ সদস্যকে ডোপ টেস্টের আওতায় আনা হয়।
এর মধ্যে বেশির ভাগ ফেনসিডিল সেবন করেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছে ইয়াবায় আসক্তিও। এ ছাড়া মদ ও গাঁজায় আসক্তি আছে অনেকের।
যা বলছে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ : মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডোপ টেস্ট নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এত দিন এএসপি থেকে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা এ পরীক্ষার আওতায় আসেননি। এতে বিভিন্ন সময়ে বাহিনীর ভেতরেই দাবি ওঠে সবার জন্য সমান নিয়ম করার।
পুলিশের নন-ক্যাডার সদস্যদের অভিযোগ : পুলিশের নন-ক্যাডার সদস্যদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, ডোপ টেস্ট চালুর পর শুধু নন-ক্যাডারদের তালিকা করে পরীক্ষা করা হয়েছে। রহস্যজনকভাবে ক্যাডার সদস্যদের নাম আসছে না সে তালিকায়। তাঁদের দাবি, সব পুলিশ সদস্যের জন্যই যেন এক নিয়মে চলে। এক বাহিনীতে দ্বৈত নিয়ম যেন না হয়।
সোর্স: কালের কণ্ঠ