রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৭ অপরাহ্ন

তরুণদের আন্দোলনে চতুর্মুখী সংকটে মোদি সরকার

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬

গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পদ মিলিয়ে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ২৬তম বছরে পা রাখার পর থেকেই অভাবনীয় রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে নরেন্দ্র মোদির সরকার। তাঁর অপ্রতিরোধ্য রাজনৈতিক কৌশল আজ বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। অর্থনীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি এবং বড় পরিসরে তরুণদের রাজপথে নেমে আসার ঘটনা মিলিয়ে মোদি সরকার মুখোমুখি হয়েছে চতুর্মুখী সংকটের।

মূলত ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টে প্রকাশিত বিশ্লেষণে দেশটির সাংবাদিক শেখর গুপ্ত চলমান আন্দোলন ও দেশজুড়ে তৈরি হওয়া অস্থিরতার মধ্যে মোদি সরকারের বর্তমান অবস্থাকে একটি ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ বা চতুর্মুখী সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে, মোদির প্রধান তিন মূলনীতি– কট্টর হিন্দু জাতীয়তাবাদ, কল্যাণ উদ্যোগ এবং দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণ; সবই আজ ব্যাপক চাপের মুখে। এমনকি ভারতের গণতন্ত্রের তিন ভিত্তি, অর্থাৎ সংবিধানের প্রতি আস্থা, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতাও সংকটের মুখে। এই সংকটকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ফাটল, রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সমষ্টি হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনকে আগে কখনও এতটা দুর্বল দেখা যায়নি। একদিকে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সংশয় তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনারদেরও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে। এমনকি শীর্ষ বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়েও সম্প্রতি প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে সরকার ও বিরোধী দুপক্ষই বিচার বিভাগের দ্বিমুখী আচরণ নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে জিডিপি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সাবেক আমলা সুভাষচন্দ্র গর্ভ যে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, তা বাড়তি চাপে ফেলেছে সরকারকে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সমস্যা ঘনীভূত হচ্ছে
অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে এবং ভারতীয় রুপির ওপর তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ। শেয়ারবাজারে ক্রমাগত দর পতনের ফলে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ও খরা বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কৃষি উৎপাদনে।

রাজনৈতিক অঙ্গনে রাহুল গান্ধীর আন্দোলন মূলধারার গণমাধ্যমে গুরুত্ব পাচ্ছে এবং জেন-জি তরুণদের ‘ট্রল’ ও প্রতিবাদের পাশাপাশি সিজেপির মতো সংগঠনগুলো জাতীয় এজেন্ডা তৈরিতে সক্ষম হচ্ছে। চিরাগ পাসওয়ান বা ওম প্রকাশ রাজভরের মতো ছোট শরিক দলগুলোর অসন্তোষ ও প্রকাশ্য সমালোচনা যেমন বাড়ছে, তেমনি সীমানা পুনর্নির্ধারণ, সংসদ অধিবেশন পরিচালনা এবং দীর্ঘদিন ধরে খালি থাকা মন্ত্রিসভার পদগুলো পূরণে সরকারের দ্বিধাদ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক প্রভাব, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং পাকিস্তানের নতুন কৌশলগত সুবিধার ফলে ভারতের ওপর ভূরাজনৈতিক চাপও বহু গুণ বেড়ে গেছে।

বড় চিন্তা তরুণদের সামলানো
গত মে মাসে ভারতের বেকার যুবকদের তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জন্ম নেয় ব্যঙ্গাত্মক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। একই মাসে মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে ও অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার পর প্রশাসনিক অনিয়মের বিরুদ্ধে তরুণদের সংগঠিত করে দলটি। অল্প কয়েক দিন পর দিল্লিতে তাদের ডাকা বড় পরিসরের আন্দোলন দমাতে কঠোর পদক্ষেপ নেয় বিজেপি সরকার। ইন্টারনেট বন্ধ করা, বায়োমেট্রিক নজরদারি, লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, ওয়াটার ক্যানন ব্যবহার এবং আন্দোলনকারীদের ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দেওয়ার মতো কঠোর দমনপীড়ন সত্ত্বেও পিছু হটেনি সিজেপি। শেষ পর্যন্ত তাদের আন্দোলনে গত ২৫ জুলাই তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগে বাধ্য হন।

তবে বিজেপির জন্য মন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, সবচেয়ে বড় চিন্তা প্রথমবার আন্দোলনে নামা তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে, যারা সরাসরি সরকার ও নরেন্দ্র মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত। তাদের আন্দোলন ভারতে মোদির সমালোচনাকে স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত করেছে।

সিজেপি তাদের এই সফলতার পর কয়েকটি রাজ্যজুড়ে সরকারি স্কুল সংস্কারের আন্দোলন শুরু করে এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ বাড়ায়। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা সংশোধনে অনিয়মের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে তরুণ আন্দোলনকারীরা। দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার কারণে সাম্প্রতিক রাজ্য নির্বাচনগুলোয় বিজেপি অনৈতিকভাবে জয়ী হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনকারীরা দিল্লির যন্তরমন্তরে সমাবেশের পরিকল্পনা করে। বিক্ষোভ রুখতে গতকাল শনিবার পুরো দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা আরোপ করে সরকার। শহরজুড়ে হাজার হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়, কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা স্থগিত রাখা হয় এবং বেশ কয়েকটি মেট্রোস্টেশন ও বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পুলিশ দিল্লি থেকে দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করে। কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গতকাল শনিবার আটকের সংখ্যা অন্তত পাঁচ হাজার ছাড়িয়েছে। ইউটিউবার ও অ্যাক্টিভিস্ট ধ্রুব রাঠি, ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকে, জ্যেষ্ঠ নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল ছাড়া মানিক সরকার ও পিনারাই বিজয়নের মতো শীর্ষ বিরোধী নেতাদেরও আটক করা হয়। আটক করা হয় কয়েকজন সাংবাদিককেও।

রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাচ্ছে
বিশ্লেষকরা বলছেন, আসন্ন ২০২৭ সালের রাজ্য নির্বাচন ও ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগে এই পুঞ্জীভূত অসন্তোষ নরেন্দ্র মোদির জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক পরীক্ষা। রাজপথের আন্দোলন, প্রাতিষ্ঠানিক অনাস্থা এবং তরুণ প্রজন্মের প্রশ্ন তোলার স্পৃহা প্রমাণ করে, ভারতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। চাপ প্রয়োগ করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও গণতন্ত্র ও জবাবদিহির দাবিতে জেগে ওঠা এই নতুন প্রজন্মকে থামানো মোদি সরকারের জন্য আগামী দিনগুলোতেও চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে– এমনটাই বলছেন পর্যবেক্ষকরা।

সূত্র : সমকাল অনলাইন

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD