বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ডেঙ্গুতে আরো সাতজনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১,৩৭৩ ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি, পাবেন যারা ঢাকার ৩৩ পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন, নিরাপত্তায় ১৬ সহস্রাধিক পুলিশ সরকার ব্যর্থ হলে জনগণই ভোটের মাধ্যমে তার জবাব দেবে: চিফ হুইপ ‘মাটি খেয়ে থাকব, তবু এক ইঞ্চি ভূখণ্ড ছাড়ব না’: ইরানের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ৭ রোগে আক্রান্তরা পাবেন এক লাখ টাকা, আবেদন করবেন যেভাবে পাকিস্তান এমন একটি দেশ, যার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রাখাটা জরুরি আগামীকাল খুলনা ও বাগেরহাট যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী ফরাসি বিক্ষোভকারীদের নতুন স্লোগান ‘বিসমিল্লাহ’ রূপপুরে পৌঁছেছে ইউরেনিয়ামের দ্বিতীয় চালান

ফরাসি বিক্ষোভকারীদের নতুন স্লোগান ‘বিসমিল্লাহ’

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬

গত সপ্তাহে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসেন লাখ লাখ মানুষ । এ সময় অনেকের হাতে থাকা কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় একটি স্লোগান, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’।

আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’ অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। আর ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’ অর্থ ‘এটি অন্ধকার’। এ দুইয়ের মিশেলে তৈরি হয়েছে স্লোগানটি। বাক্যটির অর্থ আপাতদৃষ্টিতে অস্পষ্ট মনে হতে পারে।

তবে এর আক্ষরিক অর্থের চেয়ে তাৎপর্য অনেক বেশি। গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবের প্রতিবাদে তরুণদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই এটি প্রজন্মগত ব্যবধানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এই বিক্ষোভই পরে ব্যাপক অস্থিরতায় রূপ নেয়।

কোথা থেকে এ স্লোগানের উৎপত্তি

ধারণা করা হচ্ছে, স্ন্যাপচ্যাটে প্রকাশিত একটি বার্তা থেকেই স্লোগানটির সূত্রপাত। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টা করছিলেন এমন এক ব্যক্তি বার্তাটি পাঠান।

বার্তার শুরুতে লেখা ছিল ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’, যা ফ্রান্সের তরুণদের মধ্যে প্রচলিত আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্র কথ্যরীতির অনুকরণ বলে মনে হয়। এরপর ওই ব্যক্তি লেখেন, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব।’

একই ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্ন প্রোফাইল ব্যবহার করে একাধিকবার বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এসব প্রোফাইলে মামাদু ও আবদেল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি দেখা গিয়েছিল।

বার্তাগুলোর ভাষা হাস্যকর মনে হওয়ায় স্ন্যাপচ্যাটের অন্য ব্যবহারকারীরা সেগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এরপর কী ঘটেছিল

অনেক তরুণের সন্দেহ, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশের উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই হয়তো এসব বার্তা পাঠিয়েছিলেন। তাদের ধারণা, তরুণদের কথাবার্তার ধরন অনুকরণ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হাস্যকরভাবে ব্যর্থ হয়েছেন।

এরপর বিক্ষোভকারীরা ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান হিসেবে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ গ্রহণ করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমানোর প্রচেষ্টায় নিয়োজিত কর্তৃপক্ষকে উপহাস করা।

এখন স্লোগানটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের উত্তেজনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও বর্ণগত সংখ্যালঘুদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কের টানাপোড়েন এতে প্রতিফলিত হয়েছে।

ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের সন্তান, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত ফরাসিরা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আসছেন। তাদের মতে, আলোচিত বার্তাগুলো কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাদের ভুল বোঝা এবং তাদের সম্পর্কে পূর্বধারণা পোষণের বিষয়টিও তুলে ধরে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটি স্পষ্ট করেনি যে তাদের কোনো এজেন্ট এই শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করেছিলেন কি না। তবে মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে, বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে তদন্তকারীরা কখনো কখনো অনলাইনে ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করেন।

মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই প্রেক্ষাপটে তদন্তকারীরা ছদ্মনাম ব্যবহার করতে পারেন, যাতে অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা যায়। সেই সঙ্গে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়।’

কেন স্লোগানটি এত আলোড়ন তুলেছে

শিক্ষার্থী বিক্ষোভকারীদের কাছে স্লোগানটির অস্বাভাবিক ভাষা তাদের আন্দোলন এবং সরকারের অবস্থানের মধ্যে প্রজন্মগত ব্যবধানকে স্পষ্ট করে তুলেছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, তাদের আন্দোলনের পেছনের বাস্তবতা ও তরুণদের ভাষা—দুটিই কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ফ্রান্সের একটি বিশিষ্ট ছাত্র সংগঠনের মুখপাত্র সাবরিন খারবাখ বলেন, ‘কোনো তরুণ এভাবে কথা বলে না।’

তার ভাষ্য, তরুণেরা এই বাক্যকে নিজেদের মতো করে গ্রহণ করেছেন। এর মাধ্যমে তারা বোঝাতে চান, তাদের আন্দোলনে নজরদারি ও অনুপ্রবেশের চেষ্টা তাদের চোখ এড়ায় না। একই সঙ্গে সব বাধা সত্ত্বেও নিজেদের সংগঠিত করার সক্ষমতাও তারা তুলে ধরতে চান।

বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী সাদানি সাবাদি বলেন, স্ন্যাপচ্যাটের বার্তাগুলোতে একধরনের পূর্বধারণা প্রকাশ পেয়েছে। তারা মনে করেন, যারা অবরোধ সৃষ্টি করছে বা সবকিছু ভাঙচুর করতে চাইছে, তারা নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীর মানুষ।

প্যারিসের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী ফেদ্র কেমেনের মতে, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ এখন জাতীয় পর্যায়ের একটি রসিকতায় পরিণত হয়েছে, কারণ ‘এটি একজন তরুণের কথাবার্তা অনুকরণ করার অত্যন্ত বাজে চেষ্টা’।

তিনি আরো বলেন, ‘এটিকে বর্ণবাদী আচরণের উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ এতে এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে যে সম্পত্তি ভাঙচুর করতে যারা আসবে, তারা আরব।’

ফ্রান্সের বাইরেও কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে স্লোগানটি

ফ্রান্সের গণ্ডি ছাড়িয়ে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বেলজিয়াম ও জার্মানির বিক্ষোভেও ব্যবহৃত হয়েছে।

সুইডিশ পরিবেশবাদী কর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশকারী একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত ভিডিওতে স্লোগানটি পুনরাবৃত্তি করেন।

এই স্লোগানের জনপ্রিয়তা ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর কথাও মনে করিয়ে দেয়। সেখানেও শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলন করছেন। ভারতের প্রধান বিচারপতি তরুণ ও বেকার ভারতীয়দের ‘পরজীবী’ ও ‘তেলাপোকা’ বলে আখ্যায়িত করার পর আন্দোলনকারীরা সেই অপমানসূচক শব্দকেই নিজেদের আন্দোলনের নাম হিসেবে গ্রহণ করেন।

কীভাবে শুরু হয়েছিল বিক্ষোভ

ফ্রান্সের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গত মাসে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু হয়। কয়েকশ স্কুলে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা জরাজীর্ণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, আরো শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো এবং অতিরিক্ত চাপপূর্ণ সময়সূচি পরিবর্তনের দাবি জানান।

অনেক বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি ঘটনায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ২৪টি স্কুলে আগুন দেওয়া হয় কিংবা ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এসব ঘটনায় প্রায় ৮ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ক্রমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়ন ও অন্যান্য অধিকারভিত্তিক সংগঠনের জাতীয় আন্দোলন যুক্ত হয়। এর ফলে গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

পুলিশের কঠোর পদক্ষেপও বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। গত মাস থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের অসদাচরণের অন্তত ৩৪টি অভিযোগ তদন্ত করছে ফ্রান্সের সরকারি পুলিশ-নজরদারি সংস্থা।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD