নারায়নগঞ্জ প্রতিনিধি : আবারো করোনার ‘রেড জোন’ বা ‘হটস্পট’ হওয়ার পথে শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জ। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি আর জরিমানা আদায়েও থামানো যাচ্ছে না অতি উৎসাহী অসচেতন মানুষের স্রোতে। ফলে গত ১০ দিনে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে চলেছে আশঙ্কাজনক হারে।
গত বছর রেড জোন ঘোষণার আগে পুরো জেলায় যেখানে সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৫২ জন, সেখানে গত ২৪ ঘণ্টায় নারায়ণগঞ্জের আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১২ জনে। যা আনুপাতিক হারে ২৮% বলে নিশ্চিত করেছে জেলা সিভিল সার্জন অফিস।
এছাড়া গত ১০ দিনে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৪ জন। নারায়ণগঞ্জে কোভিড-১৯ এর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট (ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট) পরীক্ষা করার জন্য ল্যাব না থাকলেও আক্রান্তের ৭০ থেকে ৮০ভাগ ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। এদিকে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় অক্সিজেন চাহিদা নিয়ে আশঙ্কায় রয়েছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ইউনিসেফের অর্থায়নে হাসপাতালটিতে সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্ল্যান্টের কাজ শেষ হলেও গত ২ মাসেও মিলেনি তরল অক্সিজেন সরবরাহ।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (৪ জুলাই) জেলায় মোট ৩৯৮ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ১১২ জনের শরীরে কোভিড-১৯ ভাইরাস সনাক্ত হয়েছে। এর আগের ৩ দিনে সনাক্তের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৯৫ জন, ১০৯ জন ও ১০৫ জনে। কঠোর লকডাউনের মধ্যেও করোনায় এত বেশী আক্রান্তের সংখ্যা নিয়ে জেলার স্বাস্থ্য প্রশাসন চিন্তিত হলেও সাধারণ মানুষের মাঝে এনিয়ে খুব একটা আতঙ্ক বা শঙ্কার ছাপ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে জেলার ৫টি উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে বিকেল থেকে সন্ধ্যার পরপরই জমে উঠে অসচেতন মানুষের ঢল।
ইতিমধ্যেই প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে অতি তুচ্ছ কারণে শহরে ও শহরতলীতে সাধারণ মানুষের ঘর থেকে বের হওয়ার বহু কারণ দেখতে পাওয়া গেছে। এমনকি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের শূন্য ফাইল নিয়ে ঘুরতে বেড়িয়েও ধরা পরেছেন কেউ কেউ।
বিষয়টিকে আতঙ্কের বলে জানিয়ে জেলা করোনা সমন্বয় কমিটির ফোকাল পারসন ডা. সফরদার জাহিদ জানান, সারা দেশে নতুন করে যারা কোভিড-১৯ বা করোনায় পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছেন তাদের শতকরা ৮০ ভাগই ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট (ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট)। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জে কোভিড-১৯ এর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট (ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট) পরীক্ষা করার জন্য ল্যাব নেই। কিন্তু ওই হিসেবে নারায়ণগঞ্জেও এই ভ্যারিয়েন্টের আক্রান্ত অবশ্যই আছে। বাঁচতে হলে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া যাবেনা। যারা বের হবেন তাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের একমাত্র করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল খানপুরে ক্রমাগত বাড়ছে করোনা রোগী। অব্যাহত রোগীর চাপে আইসিউ বেডও ফুরিয়ে আসতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে এমনটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. ইফতেখার উদ্দিন সাগর।
তিনি জানান, সোমবার পর্যন্ত হাসপাতালের ১০টি আইসিইউ শয্যার মধ্যে ৮টিতে রোগী রয়েছেন। এছাড়াও আইসোলেশন বেডের ১০০টির মধ্যে ৩৯টিতেই রোগী আছেন। যদি আক্রান্তের সংখ্যা এমনটি থাকে তবে আগামী ২/৩ দিনের মধ্যে সবগুলো শয্যাই পূর্ণ হয়ে যাবে।
ডা. সাগর জানান, এখন এই হাসপাতালে যেটি সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন, সেটি হল সেন্ট্রাল অক্সিজেন সেবা। প্রতি ২৪ঘন্টায় আমাদের ৩বার ট্রাক পাঠিয়ে খালি সিলিন্ডার অক্সিজেন পূর্ণ করতে হচ্ছে। কিন্তু সেন্ট্রাল অক্সিজেন শুরু হলে আমরা প্রতিটি বেডে হাই ফ্লো অক্সিজেন সাপ্লাই করতে পারব।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চলতি বছরের ৯ মে হাসপাতাল চত্তরে অক্সিজেন ট্যাংক স্থাপন করা হলেও একটি বারের জন্যও তরল (লিকুইড) অক্সিজেন আসেনি।
হাসপাতালটির চিকিৎসা তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাসার বলেন, ২ মাসের বেশী সময় পার হয়ে গেলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা এখনও এই প্ল্যান্টে অক্সিজেন (লিকুইড অক্সিজেন) সরবরাহ করতে পারেনি। আমরা ১০টি আইসিইউ বেডে পাশাপাশি আরও কমপক্ষে ৫টি আইসিইউ বেড তৈরির সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছি। অক্সিজেনের জন্য জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে স্থানীয় ২ এমপি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা চেষ্টা করে চলেছেন। কিন্তু স্পেক্ট্রা বলছে দেশের যেসব এলাকায় করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে সেখানে অক্সিজেন সাপ্লাই করতে গিয়ে তারা আমাদের সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। কিন্তু যেভাবে নারায়ণগঞ্জে রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে এই মুহূর্তে আমাদের সেন্ট্রাল অক্সিজেন চালু করাটা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছে। দ্রুত অক্সিজেন সরবরাহ করা হবে বলে আশ্বাস পেয়েছেন তারা।