ইরানের সঙ্গে চলমান দ্বন্দ্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এখন এক গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের নিজের নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণেই আজ এই পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। তিনি এমন একটি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন যার কোনো নিশ্চিত সমাপ্তি ছিল না এবং এমন একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করেছিলেন যা মূল সংকট সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে।
গত বুধবার হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার জেরে মার্কিন বাহিনী ইরানে নতুন করে বিমান হামলা চালায়। এই হামলার পর ট্রাম্পের সামনে এখন বড় দুটি প্রশ্ন। তিনি কি যুদ্ধ আরো বাড়াবেন? যার মানবিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য হতে পারে বিশাল, নাকি ইরানের সাথে একটি ত্রুটিপূর্ণ যুদ্ধবিরতি চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবেন? যেখানে আলোচনার টেবিলে বসতেই ইরানকে কোটি কোটি ডলার দিতে হবে।
কৌশলগত ব্যর্থতার মুখে সমঝোতা স্মারক
মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ট্রাম্প তেহরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিলেন এবং এটিকে নিজের একটি বড় সাফল্য হিসেবে দাবি করেছিলেন। কিন্তু নতুন করে শুরু হওয়া এই হামলা-পাল্টা হামলা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ প্রমাণ করেছে।
সমঝোতা স্মারকটি প্রস্তুত করেছিলেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। কিন্তু এটি এতটাই অস্পষ্ট এবং এতে কোনো কঠোর নিয়ম না থাকায় এটি ইতোমধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
তুরস্কের ন্যাটো সম্মেলনে যাওয়ার পথে ক্ষুব্ধ ট্রাম্প জানান, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকটি এখন ‘শেষ’। তিনি ইরানকে ‘পাগল’ বলেও আখ্যা দেন।
তবে তার প্রতিনিধিরা চাইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন বলে তিনি জানান।
একই সাথে তিনি বলেন, ‘আমাদের চুক্তির অধীনে তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। তবে চুক্তি হবে কি-না তা আমি জানি না। চুক্তি ছাড়াও আমরা এটি করতে পারি, কারণ সেটিই সহজ।’
যুদ্ধ বাড়ানোর বড় চড়া মূল্য
ট্রাম্প যদি যুদ্ধ বড় আকারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তবে তার হাতে বিকল্প খুবই সীমিত। ইরানে সরাসরি সেনা অভিযান অসম্ভব হলেও, তিনি দেশটির বেসামরিক অবকাঠামো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় এলাকায় হামলা চালাতে পারেন। এছাড়া ইরানের খার্গ দ্বীপের তেল কেন্দ্রটি দখল করার পরিকল্পনাও করতে পারেন।
কিন্তু এই ধরনের পদক্ষেপের খরচ হবে বিপুল। খার্গ দ্বীপে হামলা চালাতে গেলে বহু মার্কিন সেনা হতাহতের ঝুঁকিতে পড়বে।
এছাড়া মার্কিন হামলার জবাবে ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী দেশ এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়, তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি হতে পারে।
এর ফলে আমেরিকার বাজারেও তেলের দাম অনেক বেড়ে যাবে, যা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে।
মার্কিন হাউস আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য অ্যাডাম স্মিথ সিএনএনকে বলেন, ‘যারা ট্রাম্পকে কাজ শেষ করার কথা বলছেন, তারা ভুল করছেন। আপনি ইরানকে পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারবেন না। এই যুদ্ধ শুরু করার মূল যুক্তিটিই ত্রুটিপূর্ণ ছিল।’
অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিস মনে করেন, ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প হতে পারে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।
তিনি বলেন, ‘আমরা খার্গ দ্বীপ জয় করতে না পারলেও সেটি অবরুদ্ধ করতে পারি। এতে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এর ফলে ইরানও ভয়াবহ প্রতিশোধ নিতে পারে।
সরে দাঁড়ানোর পরিণতি ও অভ্যন্তরীণ বিতর্ক
ট্রাম্পের সামনে আরেকটি পথ হলো এই পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়ানো। কিন্তু তেমনটি করলে হরমুজ প্রণালি অনিরাপদ হয়ে পড়বে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়বে, যা আমেরিকার শেয়ারবাজারকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তেল সরবরাহ কমে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব জরুরি তেলের মজুতও শেষ হয়ে যেতে পারে।
এছাড়া বিষয়টি এড়িয়ে গেলে তা মার্কিন ক্ষমতার জন্য একটি বড় পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে।
এই সংকটের কারণে ট্রাম্পের শীর্ষ আলোচনাকারী উইটকফ ও কুশনারের যোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান বিষয়ের অভিজ্ঞ সরকারি কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিশেষজ্ঞদের সাথে খুব কমই পরামর্শ করা হয়েছিল। যদিও হোয়াইট হাউস এই সমালোচনাকে বাইরে থেকে আসা সাধারণ অভিযোগ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে মার্কিন হামলার পর ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে হুমকি দিয়ে লিখেছেন, ‘এমন ঘটনা আবার ঘটলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে’।
তবে যুদ্ধের শুরুর দিকে আমেরিকা ও ইসরাইলের ব্যাপক বোমাবর্ষণের পরও ইরান যখন নতি স্বীকার করেনি, তখন এই হুমকিতে তারা পিছপা হবে না বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তুরস্ক থেকে ফেরার পথে এয়ারফোর্স ওয়ানে বসে ট্রাম্প আবারও তার পুরনো কথার পুনরাবৃত্তি করে বলেন, ‘ওরা একটু আগে ফোন করেছিল, ওরা চুক্তি করার জন্য খুব মরিয়া।’ অথচ মাসের পর মাস ট্রাম্প এই দাবি করলেও বাস্তবে তার কোনো প্রমাণ মেলেনি।