মানুষের জীবনে হারানোর বেদনা নতুন কিছু নয়। কখনো হারিয়ে যায় প্রিয় কোনো মানুষ, কখনো মূল্যবান সম্পদ, আবার কখনো এমন কোনো বস্তু যা আমাদের স্মৃতি, অনুভূতি কিংবা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ে কেনা একটি জিনিস, প্রিয়জনের দেওয়া উপহার, প্রয়োজনীয় কোনো কাগজপত্র কিংবা অত্যন্ত প্রিয় কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ হারিয়ে গেলে হৃদয়ে কষ্টের ঝড় বয়ে যায়। তখন অনেকেই হতাশ হয়ে পড়েন, অস্থির হয়ে ওঠেন এবং বারবার আফসোস করতে থাকেন।
তবে ইসলাম মানুষকে বিপদ, দুঃখ ও ক্ষতির মুহূর্তেও ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দেয়। মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, সে জানে পৃথিবীর সবকিছুই মূলত আল্লাহ তায়ালার আমানত। তিনি যা দান করেন, তা তাঁর ইচ্ছাতেই দেন; আবার তাঁর ইচ্ছাতেই তা ফিরিয়ে নেন। তাই কোনো কিছু হারিয়ে গেলে বা কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হলে একজন মুসলমান হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, তাঁর কাছে সওয়াব ও উত্তম প্রতিদানের আশা করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে এমন একটি দোয়া শিখিয়েছেন, যা বিপদ, ক্ষতি বা প্রিয় কিছু হারিয়ে যাওয়ার সময় পড়লে আল্লাহ তায়ালার রহমত ও প্রতিদান লাভের আশা করা যায়। এই দোয়া মানুষের হৃদয়কে প্রশান্ত করে, ক্ষতির কষ্টকে সহজ করে এবং আল্লাহর ওপর ভরসা বাড়িয়ে দেয়।
দোয়াটি হলো, اِنَّا لِلّٰهِ وَاِنَّا اِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ. اَللّٰهُمَّ أْجُرْنِيْ فِـيْ مُصِيْبَتِيْ. وَاَخْلِفْ لِيْ خَيْرًا مِّنْهَا
উচ্চারণ: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন, আল্লাহুম্মা জুরনি ফি মুসিবাতি ওয়া আখলিফ লি খাইরাম মিনহা। (মুসলিম: ২০১১)
বাংলা অর্থ: ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। হে আল্লাহ! আমার এ বিপদে আমাকে সওয়াব দান করুন এবং এর পরিবর্তে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন।’
দোয়ার তাৎপর্য
সিলেটের দারুল উলুম কানাইঘাট মাদ্রাসার নায়েবে শায়খুল হাদিস শামছুদ্দীন দুর্লভপুরি কালবেলাকে বলেন, এই দোয়ার প্রথম অংশে একজন মুমিন স্বীকার করেন যে, তিনি এবং তাঁর সবকিছুই আল্লাহর মালিকানাধীন। তাই কোনো কিছু হারিয়ে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা নিয়ে বিদ্রোহ না করে আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা উচিত। দ্বিতীয় অংশে তিনি আল্লাহর কাছে ধৈর্যের সওয়াব এবং হারানো জিনিসের পরিবর্তে আরও উত্তম কিছু পাওয়ার প্রার্থনা করেন।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) তাঁর স্বামী আবু সালামা (রা.)-এর মৃত্যুর পর এই দোয়া পাঠ করেছিলেন। পরবর্তীতে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর স্ত্রী হওয়ার মতো মহাসম্মান দান করেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধারণ করলে তিনি বান্দাকে উত্তম প্রতিদান দান করেন। (মুসলিম: ২০১১)
আমাদের করণীয়
প্রিয় কোনো বস্তু হারিয়ে গেলে বা কোনো ক্ষতির মুখোমুখি হলে প্রথমেই অস্থির না হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করা উচিত। ধৈর্য ধারণ করতে হবে, বেশি বেশি ইস্তিগফার করতে হবে এবং এই দোয়াটি আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ তাআলা কখনো বান্দার কোনো ত্যাগ, ধৈর্য বা কষ্টকে বৃথা যেতে দেন না। তিনি চাইলে হারানো জিনিস ফিরিয়ে দিতে পারেন, আর না দিলে তার চেয়েও উত্তম কিছু দান করতে পারেন।