রেকর্ড পরিমাণ কম বৃষ্টিপাত এবং এল-নিনোর প্রভাবে বিশ্বে উষ্ণায়নের এক চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে । দেশে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে চলতি জুন মাসে।
বছরের দ্বিতীয় বৃষ্টির মাস বলে পরিচিত জুনে সাধারণত গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে থাকে। কিন্তু এবার গত মঙ্গলবার পর্যন্ত চলতি মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৭ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মাসের যে কদিন বাকি আছে, তাতেও পর্যাপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
সংস্থাটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় জুলাই মাসে, গড়ে ৫২৩ মিলিমিটার। চলতি বছরের জুলাই মাসেও কম বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আবহাওয়ার এই পরিস্থিতিকে খুবই অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন আবহাওয়াবিদেরা।
এ প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানা বলেন, বিগত এক দশকের মধ্যে এ ধরনের কম বৃষ্টিপাত আর কখনো লক্ষ করা যায়নি। এবার জুলাই মাসেও কম বৃষ্টি হতে পারে। এটা আবহাওয়ার খুবই অস্বাভাবিক আচরণ বলে মনে করছেন তিনি।
তিনি বলেন, চলতি মাসে মঙ্গলবার পর্যন্ত স্বাভাবিকের চেয়ে ৪৭ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। মাসের যে কদিন বাকি আছে, তাতেও পর্যাপ্ত বৃষ্টির সম্ভাবনা কম। তবে আগামী ২৮ জুন থেকে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ বাদে অন্যান্য অঞ্চলে বৃষ্টি বাড়তে পারে।
সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে এবারের বর্ষা তথা জুন-জুলাই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত এবং বেশি তাপমাত্রা থাকার কথা আগেই জানানো হয়েছিল। যদিও এবার মৌসুমের উষ্ণতম এপ্রিল-মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ সম্পর্কে আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি এল-নিনোর প্রভাবও রয়েছে। এল-নিনো এমন এক প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর দেখা দেয়। ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিয়ত বায়ু (ট্রেড উইন্ড) দুর্বল হয়ে পড়লে মহাসাগরের উপরিভাগে উষ্ণ পানি জমতে শুরু করে—যার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। উষ্ণায়নের এই অঞ্চলটি আকারে প্রায় আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের সমান এবং এটি নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলেই ঘটে থাকে। তবে এর প্রভাব অনুভূত হয় বিশ্বজুড়ে।
নাসার গডার্ড ইনস্টিটিউট ফর স্পেস স্টাডিজের পরিচালক গ্যাভিন স্মিডট জানান, ‘ক্রান্তীয় অঞ্চলের বায়ুমণ্ডলের এই পরিবর্তন হাজার হাজার মাইল দূরের মধ্য-অক্ষাংশের আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলে।’
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, খুব শিগগিরই এই পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে এবং তা অন্তত আগামী শীতকাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এর তীব্রতা ও স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, বন্যা, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং খাদ্য ও পানি সরবরাহে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে একটি জরুরি জলবায়ু সতর্কতা হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘এল-নিনো পরিস্থিতি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করবে।’