শেষ বাঁশি বাজতেই যেন থমকে গেলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। স্টেডিয়ামের আলো তখনও ঝলমল করছে, গ্যালারিতে হাজারো দর্শকের গর্জন ধীরে ধীরে স্তিমিত হচ্ছে, কিন্তু আল নাসর তারকার চোখে তখন শুধু হতাশার ছায়া। হাঁটছিলেন, অথচ মনে হচ্ছিল পা যেন এগোচ্ছে না। ধীরে ধীরে ডাগআউটের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়লেন। এরপর ক্যামেরায় ধরা পড়ল এক অন্য রোনালদো—চোখ ভেজা, মুখ নিচু, বারবার হাত দিয়ে চোখ মুছছেন।
শনিবার (১৬ মে) রাতে এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগ টু-এর ফাইনালে জাপানের গাম্বা ওসাকার কাছে ১-০ গোলে হেরে আরও একবার শিরোপাহীন থেকে গেল আল নাসর। আর সেই সঙ্গে দীর্ঘ হলো রোনালদোর ট্রফি খরাও।
রিয়াদের কিং সৌদ ইউনিভার্সিটি স্টেডিয়ামে ফাইনালের আগে ফেভারিট ছিল সৌদি জায়ান্ট আল নাসরই। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা দলটি টানা ১০ ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠেছিল। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এসে ভেঙে গেল সেই ছন্দ। ম্যাচের ৩০তম মিনিটে ডেনিজ হুমেটের একমাত্র গোলেই ইতিহাস গড়ে গাম্বা ওসাকা।
পুরো ম্যাচজুড়ে বল দখল, আক্রমণ, শট—সব পরিসংখ্যানেই এগিয়ে ছিল আল নাসর। তারা নেয় ২০টি শট, যেখানে গাম্বা ওসাকার ছিল মাত্র ৩টি। লক্ষ্যে শটও ছিল ৬-১ ব্যবধানে আল নাসরের পক্ষে। কিন্তু গোলটাই যে ফুটবলের শেষ কথা, সেটাই আবার মনে করিয়ে দিল জাপানি ক্লাবটি।
রোনালদো ছিলেন সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। ম্যাচে ৫টি শট নিয়েছেন তিনি, প্রতিপক্ষের বক্সে সবচেয়ে বেশি ৭ বার বল স্পর্শও তারই। সাদিও মানে, জোয়াও ফেলিক্সরাও একের পর এক সুযোগ তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ১৮ বছর বয়সী গোলরক্ষক রুই আরাকি যেন একাই দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ফেলিক্সের শক্তিশালী শট, মানের কাছাকাছি সুযোগ কিংবা রোনালদোর নিশ্চিত গোল—সবই থামিয়ে দেন এই তরুণ গোলরক্ষক।
বিশেষ করে ৮৬তম মিনিটে রোনালদোর প্রায় নিশ্চিত গোললাইন প্রচেষ্টা জেন্তা মিউরার ব্লকে কর্নারে পরিণত হলে হতাশা আরও বাড়ে। শেষ দিকে মরিয়া হয়ে আক্রমণ চালিয়েও সমতায় ফিরতে পারেনি আল নাসর।
ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানেও দেখা যায়নি রোনালদোকে। সাধারণত অধিনায়ক হিসেবেই সবার আগে রানার্সআপ পদক নিতে হয়। কিন্তু আল নাসরের খেলোয়াড়েরা কোচের সঙ্গে মঞ্চে উঠলেও রোনালদো ছিলেন দূরে। হতাশা যেন তাকে গিলে ফেলেছিল।
এই হার রোনালদোর জন্য শুধুই আরেকটি ফাইনাল হার নয়, বরং আরও দীর্ঘ হওয়া এক শিরোপা অপেক্ষার গল্প। ইউরোপে পাঁচটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা, অসংখ্য রেকর্ড গড়া এই পর্তুগিজ মহাতারকা আল নাসরে যোগ দেওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো স্বীকৃত বড় ট্রফি জিততে পারেননি। ২০২৩ সালে সৌদি ক্লাবটিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি ১৪টি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন, কিন্তু প্রতিবারই শিরোপা হাতছাড়া হয়েছে।
রোনালদোর শেষ বড় ক্লাব ট্রফি ছিল জুভেন্টাসের হয়ে কোপা ইতালিয়া জয়। এরপর কেটে গেছে পাঁচ বছর। এর মধ্যে সৌদি প্রো লিগ, কিংস কাপ, সৌদি সুপার কাপ ও মহাদেশীয় প্রতিযোগিতা—সব জায়গাতেই হতাশা সঙ্গী হয়েছে তার।
যদিও আরব ক্লাব চ্যাম্পিয়নস কাপ জিতেছিল আল নাসর, তবে সেটিকে ফিফা বা এএফসির আনুষ্ঠানিক শিরোপা হিসেবে ধরা হয় না। ফলে রোনালদোর অফিসিয়াল ক্যারিয়ারে সেই ট্রফির স্বীকৃতি নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেছে।
তবে সব শেষ হয়ে যায়নি এখনো। সৌদি প্রো লিগে শিরোপার দৌড়ে এখনো এগিয়ে আছে আল নাসর। আল হিলালের চেয়ে দুই পয়েন্টে এগিয়ে থাকা দলটি বৃহস্পতিবার দামাক এফসির বিপক্ষে জিতলেই লিগ চ্যাম্পিয়ন হবে। সেটাই এখন রোনালদোর সামনে শেষ সুযোগ।
তার আগে পর্যন্ত হয়তো শনিবার রাতের সেই দৃশ্যই ঘুরে ফিরে আসবে ফুটবলপ্রেমীদের চোখে—এক কিংবদন্তি বসে আছেন ডাগআউটে, চোখ ভেজা, আরেকটি ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার বেদনায় নীরব হয়ে।