মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ন

ট্রাম্পের ইরান চুক্তিকে নতি স্বীকার বলছেন রিপাবলিকানরা

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬

ইরান যুদ্ধ শেষ করতে ট্রাম্প প্রশাসন একটি চুক্তির দিকে এগোচ্ছে-এমন আভাস পাওয়ার পর থেকেই মার্কিন ক্ষমতাসীন দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থি অংশের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের আশঙ্কা, তেহরানের ওপর থেকে চাপ সরিয়ে নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ইরানের কাছে নতি স্বীকার করতে যাচ্ছেন।

মাসখানেক আগেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করার জন্য তিনি মোটেও ‘উদ্বিগ্ন’ নন এবং তার হাতে যথেষ্ট সময় রয়েছে। তবে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসা এবং যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক প্রভাব রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ানোয়, যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসার জন্য ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে।

সম্প্রতি একটি সমঝোতা স্মারকের খসড়া তথ্য ফাঁস হওয়ার পর গত দুই দিনে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রিপাবলিকান নেতা প্রকাশ্যে ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন।

খসড়া অনুযায়ী, এই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটবে, ধীরে ধীরে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত হবে এবং ওই অঞ্চলে মার্কিন অবরোধের সমাপ্তি ঘটবে। বিনিময়ে ইরান তার কিছু ফ্রিজ করা বা অবরুদ্ধ তহবিল ফেরত পাবে এবং পুনরায় জ্বালানি ও তেল বিক্রির অনুমতি পাবে।

এছাড়া ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দেবে এবং উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত পরিত্যাগের বিষয়ে আলোচনা শুরু করবে।

তবে এই শর্তগুলো ট্রাম্পের প্রাথমিক অবস্থানের চেয়ে অনেক দুর্বল। কারণ, একসময় ট্রাম্প ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবি করেছিলেন এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে দেওয়া সমর্থন পুরোপুরি বন্ধের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন।

সিনেটের সশস্ত্র পরিষেবা কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার এক বিবৃতিতে ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, তিনি (ট্রাম্প) ভুল পরামর্শের শিকার হচ্ছেন এবং এমন একটি চুক্তির পেছনে ছুটছেন যা ‘যে কাগজে লেখা হবে, সেই কাগজের মূল্যের সমানও হবে না।’

তিনি আরো বলেন, সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে চুক্তি করার এই সিদ্ধান্ত আমেরিকার ‘দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ’ ঘটাবে।

উইকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এর ফলে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মাধ্যমে অর্জিত সবকিছুই বৃথা যাবে।

সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করার এবং প্রতিবেশীদের তেল অবকাঠামোতে হুমকি দেওয়ার সুযোগ পায়, তবে তা হবে অঞ্চলের ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি বড় পরিবর্তন এবং দীর্ঘমেয়াদে ইসরাইলের জন্য একটি দুঃস্বপ্ন। এটি হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে আরো শক্তিশালী করবে।

টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, যে ইরান এখনো ‘আমেরিকার ধ্বংস চাই’ স্লোগান দেয়, তারা যদি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার পায়, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সুযোগ রাখে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ পায়, তবে তা হবে একটি ‘বিপর্যয়কর ভুল’।

এমনকি ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বলেছেন, এর মাধ্যমে ‘ইরানিরা একটি বড় বিজয় পেতে যাচ্ছেন।’

আরেক সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন ট্রাম্পকে ইরানকে বিশ্বাস না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, এই সরকার আগেও সরাসরি মিথ্যা বলেছে।

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এই চুক্তির রূপরেখাকে ওবামা প্রশাসনের ইরান পারমাণবিক চুক্তির সঙ্গে তুলনা করে তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং একে ‘আমেরিকা ফার্স্ট নীতি বিরোধী’ বলে অভিহিত করেছেন।

ফক্স নিউজের ধারাভাষ্যকার মার্ক লেভিনও এই চুক্তি নিয়ে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন।

সমালোচকদের এমন আক্রমণের মুখে ট্রাম্পের উপদেষ্টারাও পাল্টা জবাব দিচ্ছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র স্টিভেন চেউং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেওকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে মুখ বন্ধ রাখতে বলেছেন।

ট্রাম্পের রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যালেক্স ব্রুসেউইটজ সিনেটর টেড ক্রুজকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, কেউ তার মতামত চায়নি এবং তিনি যেন প্রশাসনকে দুর্বল করার চেষ্টা না করেন।

অবশ্য ক্রুজও এর জবাবে ট্রাম্পের এই তরুণ উপদেষ্টাদের ‘রাজনৈতিক প্রতারক’ বলে কটাক্ষ করেছেন।

ভারতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের স্থলাভিষিক্ত হওয়া বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অবশ্য নরম সুরে ট্রাম্পের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেছেন, পারমাণবিক ইরানকে ঠেকানোর বিষয়ে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কারো প্রশ্ন তোলা উচিত নয় এবং ট্রাম্পের চুক্তির কারণে ইরান শক্তিশালী হবে-এমন ভাবনা ‘অযৌক্তিক’।

খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার ট্রুথ সোশ্যালে সমালোচকদের ‘লুজার’ আখ্যা দিয়ে লিখেছেন, ‘যারা কোনো কিছু না জেনে সমালোচনা করছে, তাদের কথা শুনবেন না।’

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও তার আলোচকেরা বর্তমানে একটি কঠিন পরিস্থিতিতে রয়েছেন। তারা এই যুদ্ধ এক মাসের মতো স্থায়ী হবে বলে ধারণা করলেও এখন তা প্রায় তিন মাসে পদার্পণ করছে। ট্রাম্পের বারবার দেওয়া হুমকি ও ফাঁকা আওয়াজে ইরান কোনো নতি স্বীকার করেনি। ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন হয় নতুন করে সামরিক হামলা শুরু করা (যা তিনি চান না), অথবা একটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়িষ্ণু অর্থনৈতিক যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়ার পথ খোলা রয়েছে।

ট্রাম্প এত দিন তার দলের যুদ্ধবিরোধী অংশকে ক্ষুব্ধ করে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, আর এখন চুক্তি করতে গিয়ে তিনি দলের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কট্টরপন্থিদের ক্ষুব্ধ করার ঝুঁকিতে পড়েছেন, যারা এই যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানি হুমকির চিরতরে অবসান চেয়েছিল।

সূত্র: সিএনএন

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD