মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২:৪৩ অপরাহ্ন

পার্বত্য শান্তিচুক্তির পক্ষে-বিপক্ষে মত দিল বাঙালি ও আদিবাসীরা

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫

‘নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী’ নাগরিক প্ল্যাটফর্মের এমন প্রশ্নে রাঙামাটিতে বসবাসরত বাঙালি ও আদিবাসী নাগরিকরা ই-ভোটিংয়ের মাধ্যমে পার্বত‍্য শান্তিচুক্তি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। ভোটারদের একটি অংশ শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে থাকলেও আরেকটি অংশ এই চুক্তি বাতিলের দাবি তুলেছেন।

এদিকে বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলছেন, রাঙামাটিতে বাঙালি ও আদিবাসীদের একসঙ্গে সভা করার ঘটনা একেবারেই বিরল। সেখানে বৃহস্পতিবার স্থানীয় ঝগড়া বিল এলাকার বার্গী লেক ভ‍্যালিতে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সর্বশেষ সভায় এমন সহাবস্থানের ঘটনা ঘটেছে।

এ সভায় রাঙামাটির নাগরিকরা সংস্কার ও আগামী নির্বাচন নিয়ে তাদের প্রত্যাশার কথাও ভোটাধিকারের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাদের প্রত্যাশা- অবৈধ অস্ত্রমুক্ত পাহাড়, ভূমি সমস‍্যার সমাধান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, সুশাসন, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি প্রতিরোধ, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা।

নাগরিকরা পরে দ্বিতীয় দফায় ই-ভোটে অংশ নিয়ে ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে আপনার প্রত্যাশা কী’ এমন প্রশ্নের বিষয়ে তাদের অভিমত দেন। এ ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, কালো টাকা ও সেনামুক্ত নির্বাচন, দুর্গম এলাকায় ভোট ডাকাতি বন্ধ, অযোগ্য নেতাকে লাল কার্ড দেখানো, দেশবিরোধী দল নিষিদ্ধ, নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতার মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া প্রায় আড়াই ঘণ্টার এই পরামর্শ সভা সঞ্চালন করেছেন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেছেন, সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। সংস্কার হচ্ছেও। অথচ রাজনৈতিক দলগুলোতে সংস্কার হচ্ছে না। কিন্তু কেন? রাজনৈতিক দলগুলোতে এখনও পরিবারতন্ত্র চলছে।

স্থানীয় নাগরিকরা সভায় পার্বত‍্য জেলা রাঙামাটির বিভিন্ন সমস‍্যা তুলে ধরে সমাধান চেয়েছেন। তারা বলেছেন, গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করা হলেও বিচার হচ্ছে না। কেউ কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে আরও সেনা ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব করলেও সেনা ক‍্যাম্প সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সভার সূচনা বক্তব্যে বলেছেন, ৯০ দশকে সামরিক সরকার বদল হয়েছে। কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারী সরকারও পালাতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু অনেক সময়ই সব পরিবর্তন সঠিকভাবে রূপায়িত হয় না। তাই পরিবর্তনকে স্থায়ী রুপ দিতে হলে সংস্কার কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে হবে।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানতে চান, পুলিশের পরিবর্তন করা পোশাক পছন্দ হয়েছে কিনা? এর জবাবে সমবেত সকলে বলেছেন, পুলিশের নতুন পোশাক তাদের পছন্দ হয়নি।

সমস্যার সমাধান করে যেতে চাই পরবর্তী প্রজন্মের জন‍্য
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের কোর গ্রুপের সদস্য ও সিপিডির আরেক সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পার্বত‍্য চট্টগ্রামের সমস‍্যা পেয়েছি। তবে আমরা এই সমস্যার সমাধান করে যেতে চাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। বিশিষ্ট এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেছেন, কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। কোনো অঞ্চলকে পেছনে ফেলে রেখে অন্তর্ভুক্তিমূলক দেশ গড়া যাবে না। তিনি পার্বত‍্য এলাকার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন।

চাকমা রানী ও তৃণমূলের দুই নেতা যা বলেছেন
চাকমা রানী ইয়ান ইয়ান বলেছেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। তিনি মব সন্ত্রাসের কারণে ভূমি কমিশনের বৈঠক হয়নি বলে জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, আদিবাসী বিরোধী তৎপরতা আরও বেড়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারি মনসুরুল হক বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যার যতটুকু নিরাপত্তা প্রয়োজন তাকে ততটুকুই নিরাপত্তা দিতে হবে। এই জনপদে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সাধারণ সম্পাদক অনুপম বড়ুয়া পার্বত‍্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে রোডম্যাপ চেয়েছেন। তিনি নিষ্ক্রিয় ভূমি কমিশনকে সক্রিয় করার পরামর্শ দিয়েছেন।

নাগরিক দাবি, অভিযোগ ও প্রত‍্যাশা
প্রায় শতাধিক নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠা এই সভায় নির্বাচন, নিরাপত্তা, সুশাসন ও দুর্নীতির বিষয় প্রাধান্য পেলেও অনেকেই পার্বত্য শান্তিচুক্তি নিয়ে কথা বলেছেন। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুরেশ কুমার চাকমা পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দাবি করেছেন।

ব‍্যবসায়ী নেতা পল্লব চাকমা বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন‍্য বাঙালি ও আদিবাসীদের সমন্বয়ে গড়া পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের জেলা সম্পাদক বখতিয়ার উদ্দিন পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পাহাড় কাটা বন্ধ এবং কাপ্তাই হ্রদ দূষণ মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। সমাজকর্মী নমিতা চাকমা ও খাগড়াছড়ির দয়াশিপ্রার দাবি, আদিবাসী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেছেন, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে সবাই উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে যাবে। তিনি আগামী সরকার সংস্কার বাস্তবায়ন না করলে সংস্কার কুসংস্কারে রূপ নেবে বলে মন্তব্য করেছেন।

পথরেখা দিতে হবে রাজনীতিকদের: ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
নাগরিক প্ল‍্যাটফর্মের প্রাক-নির্বাচনী উদ্যোগে আঞ্চলিক পরামর্শ সভায় নাগরিকদের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে এমন এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, যার জন্য জাতীয় সমাধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন‍্য এ অঞ্চলের জাতি, ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষে, সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে, সকলের অধিকারের স্বীকৃতি দিয়ে, ইতিহাসের প্রতি সম্মান দিয়ে এবং স্থানীয় বৈশিষ্টের প্রতি মনোযোগ দিয়ে সমাধানের পথরেখা বের করতে হবে। তাই নির্বাচনী ইশতেহারের ভেতরে রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে, তারা এটাকে কীভাবে কার্যকর করবেন। কীভাবে এই পথরেখার মূল মূল উপাদানের ভেতরে ভূমি সংস্কার ও স্থানীয় সরকার সংস্কারের বিষয়টি থাকতে পারে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় এবং জাতিসত্ত্বার মানুষগুলো আছে, তাদের পারস্পরিক স্বত্বাধিকারের ভিত্তিতে, তাদের পারস্পরিক স্বার্থরক্ষণ করে কীভাবে প্রতিনিধি হতে পারে, এই অঞ্চলে যে ভাবে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হয়, বিভিন্ন পক্ষ থেকে সেগুলোকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণের ভেতরে আনা যায়, কীভাবে কত দৃঢ়তার সাথে সিভিল প্রশাসনদের কাছে এখানে শাসনব্যবস্থা আরও মূলধারায় আনা সম্ভব হবে, ইত্যাদি বিষয় নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আলোচনায় এসেছে। এতে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলে যে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির বিকাশ হচ্ছে, যেখানে একাধিক প্রতিবেশী দেশ সংশ্লিষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তাতে এই বিষয়টি জাতীয় অখণ্ডতার দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আসছে। অনেক অবৈধ রোহিঙ্গা শরণার্থীও এই অঞ্চলে আসছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতীয় সংহতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে হবে। যদি এটার সমাধান না হয়, তাহলে জাতি হিসেবে, দেশ হিসেবে আমরা দুর্বল হয়ে যাব। সভায় বলা হয়েছে, দুর্গম অঞ্চলের মানুষ যাতে ভোট দিতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোটকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে; তারা যাতে নির্ভয়ে, নির্বিবাদে এবং নিরাপদে ভোট দিয়ে বাড়ি যেতে পারে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রাধান্য রাখা যাবে না।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, বাংলাদেশ একটা দোলাচলের মধ্যে আছে। অর্থাৎ একদিকে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আমরা যে পরিবর্তনগুলো চেয়েছিলাম, সেই পরিবর্তনগুলো টেকসই করার ক্ষেত্রে একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে প্রয়োজনীয়তা, সেই প্রক্রিয়ার ভেতরে আমরা নির্বাচন ঘোষণার মাধ্যমে ওই অনিবার্য পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়াকে আরেকটি পদক্ষেপ হিসেবে প্রত্যাশা করি। অপরদিকে, প্রভাবমুক্ত প্রশাসক এবং সক্ষম আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো দৃশ্যমান ক্ষেত্রে এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই দৃশ্যমান চিহ্ন আনার জন্য আগামী দুই-এক মাস সময় আছে। তার জন্য সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং সর্বোপরি সেনাবাহিনী এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, তারা তাদের ভূমিকা পালন করবে, এটা আমরা প্রত্যাশা করি। সেই সঙ্গে আস্থা সৃষ্টির জন্য বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ দৃশ্যমানভাবে নেওয়া হবে- এই আমাদের আকাঙ্ক্ষা আছে। এই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবায়ন করার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো একটা বড় শক্তি। রাজনৈতিক দলগুলো এই উত্তরণকালীন রাজনীতির ভেতরে শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা, অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি, এগুলো নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করবে।

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD