দেশের পুঁজিবাজারে নতুন কোম্পানির আগমন বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) কার্যত তলানিতে ঠেকেছে। টানা দুই বছর ধরে বাজারে কোনো নতুন কোম্পানির আইপিও আসেনি, যা দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে প্রথম। বাজারের প্রাণশক্তি হিসেবে পরিচিত ‘নতুন রক্ত’ বা আইপিওর এই দীর্ঘ স্থবিরতাকে দীর্ঘ মেয়াদে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন বাজার-বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আইপিও কেবল নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির মাধ্যম নয়; এটি বাজারে তারল্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর অন্যতম উপায়। ভালো মৌল ভিত্তির কোম্পানি বাজারে এলে নতুন বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আইপিও না থাকায় বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থাও দুর্বল হচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের জুনে টেকনো ড্রাগস সর্বশেষ কোম্পানি হিসেবে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করে। এর পর দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও আর কোনো কোম্পানি আইপিওতে আসেনি।
২০২০ ও ২০২১ সালে বাজারে আইপিওর প্রবাহ ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই সময়ে রেকর্ড পরিমাণ মূলধন সংগ্রহ হয়েছিল। ২০২২ সাল থেকে সেই ধারা কমতে শুরু করে এবং ২০২৩ ও ২০২৪ সালে পরিস্থিতি আরও সংকুচিত হয়। ২০২৪ সালে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান—এনআরবি ব্যাংক, বেস্ট হোল্ডিং, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ এবং টেকনো ড্রাগস পুঁজিবাজার থেকে মোট ৬৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এর আগের বছর ২০২৩ সালে তিনটি কোম্পানি ও একটি মিউচুয়াল ফান্ড মিলিয়ে চারটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয় মাত্র ২০২ কোটি টাকা।
২০২১ সালে ১৫টি প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে ১ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছিল। অথচ পরবর্তী বছরগুলোতে সেই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ১৫ থেকে ২০টি আইপিও বাজারে এসেছিল। এমনকি ২০০৯-২০১০ সালের অস্থির বাজারেও আইপিও কার্যক্রম ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই তুলনায় বর্তমানের দীর্ঘ আইপিও-শূন্যতাকে অস্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ‘খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন বিএসইসি কমিশন আইপিও নীতিমালাসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নতুন আইপিও আনার বিষয়টি প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়নি। আইপিও প্রক্রিয়া সচল রাখতে একটি মধ্যপন্থা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। কারণ নতুন আইপিও না থাকলে বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ ও গভীরতা- দুটিই কমে যায়। আইপিও ছাড়া কার্যকর পুঁজিবাজার কল্পনা করা যায় না।’
তবে বর্তমান কমিশনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, ‘নতুন কমিশন আইপিও কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করতে গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে শিগগিরই বাজারে নতুন কোম্পানির আগমন শুরু হবে।’
ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘টানা দুই বছর ধরে পুঁজিবাজারে কোনো নতুন আইপিও আসেনি। এর আগের দুই বছরেও হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। ফলে বাজারে নতুন বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংকট আরও প্রকট হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আইপিওর প্রবাহ বন্ধ থাকলে বাজারের গভীরতা ও পরিধি- দুটিই কমে যায়। নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হলে বাজারের আকারও বাড়ে না। তাই পুঁজিবাজার সম্প্রসারণে নতুন কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আনার বিকল্প নেই।’
সাইফুল ইসলাম আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘নতুন কমিশন শিগগিরই আরও বেশি কোম্পানিকে আইপিওর মাধ্যমে বাজারে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।’
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, ‘অতীতে আইপিও অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার চাপ তুলনামূলক কম ছিল। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে শতভাগ কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত না হলে আইপিওর অনুমোদন মিলবে না- এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতেও পর্যাপ্ত প্রণোদনা ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘ভালো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনতে এরই মধ্যে আইপিও বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সিকিউরিটিজ ভ্যালুয়েশন স্ট্যান্ডার্ডস অন্তর্ভুক্ত করায় আইপিও প্রক্রিয়া আরও সহজ হয়েছে। বর্তমান কমিশন বেস্ট প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে মানসম্পন্ন কোম্পানি বাজারে আনতে কাজ করছে। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য আড়াই শতাংশ কর ছাড়ের সুবিধাও এবার যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ইস্যুয়ার কোম্পানি, বিএপিএলসি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনও ভালো কোম্পানিকে বাজারে আনতে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই আশা করা যাচ্ছে শিগগিরই আইপিও খরা কেটে যাবে।’
সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজ (বিএপিএলসি) আয়োজিত ‘নতুন আইপিও: প্রস্তুতি, চ্যালেঞ্জ ও তালিকাভুক্তির রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনারেও নতুন কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনার ওপর জোর দেন অংশীজন। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জ, বাজার মধ্যস্থতাকারী, শিল্প খাত এবং সম্ভাব্য ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সেমিনারে বিএপিএলসি জানায়, দেশের পুঁজিবাজারের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে আরও বেশি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার বিকল্প নেই।