হাইড্রেশন ব্রেকের আগে কেপ ভার্দের বিপক্ষে মাত্র দুটি শট নিতে পেরেছে আর্জেন্টিনা। এ দুটি শটই নেন লিওনেল মেসি। কিন্তু গোল হয়নি একটিও। কেপ ভার্দের রক্ষণদুর্গে বারবার আটকে যাচ্ছিল আর্জেন্টিনার আক্রমণ। ধৈর্যহারা হয়ে পড়ছিলেন আর্জেন্টাইনরা। তবে প্রথম বিরতির পর ম্যাচের ছবি বদলে যায়। ২৯ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে মেসিকে লক্ষ্য করে এক বুদ্ধিদীপ্ত পাস দেন লিয়ান্দ্রো মার্টিনেজ। বাঁ পায়ে বল রিসিভ করে সেকেন্ডের ব্যবধানে একই পায়ের ভেলকি দেখান মেসি। তার চিপ শট ভোজিনহার মাথার ওপর দিয়ে খুঁজে নেয় জাল। আর তাতেই হয়ে গেল ইতিহাস। বিশ্বকাপে প্রথমবার ফুটবলার হিসেবে টানা আট ম্যাচে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়লেন মেসি।
গত দুই দশকে মেসির পায়ে অবিশ্বাস্য সব রূপকথার জন্ম হয়েছে। তবে এবারের বিশ্বকাপে যা করে দেখাচ্ছেন এই কিংবদন্তি, সেটি শুধু নতুন রেকর্ডের জন্ম দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারচেয়ে বেশি কিছু। মেসির এই কীর্তি পৃথিবীর সেই প্রাচীন সপ্তাশ্চর্যের তালিকা ছাড়িয়ে যেন ‘পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে! বিশ্বকাপ কঠিন মঞ্চ। এখান প্রতিটি ম্যাচ মানেই যুদ্ধ। এখানে থাকে প্রচণ্ড স্নায়ুচাপ, উচ্চ প্রত্যাশা, প্রতিপক্ষের নিখুঁত রক্ষণ আর কৌশলের বেড়াজাল ছিন্ন করে একটি গোল করাই হলো বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। আর সেখানে টানা ম্যাচে গোল করাটা অতিমানবীয় পারফরম্যান্স!
গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু মেসির। এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে করলেন জোড়া গোল। জর্ডানের বিপক্ষেও পেলেন গোল। আর নকআউট পর্বেও এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখায় চলমান বিশ্বকাপে মেসির নামের পাশে এখন সর্বোচ্চ সাত গোল। গ্রুপ পর্বেই বিশ্বকাপে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যান মেসি। বিশ্বকাপে এখন মেসির গোল ২০টি। শুধু তা-ই নয়, আরো অসংখ্য রেকর্ড গড়ে মেসি নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।
ফুটবল দলীয় খেলা। এ যুক্তি সত্য হলেও টানা ম্যাচে গোল করে দলের ভাগ্য একাই বদলে দিচ্ছেন মেসি। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে চুরমার করে বাঁ পায়ের জাদুতে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দিচ্ছে প্রতি ম্যাচে। কখনো দূরপাল্লার বাঁকানো শটে, কিংবা ডি-বক্সের ভেতর তীব্র ক্ষিপ্রতায়। আবার কখনো নিখুঁত পেনাল্টিতে গোল করে। মেসির প্রতিটি গোলের পেছনেই ছিল নিখুঁত ফুটবল মস্তিষ্কের ছাপ। এখানে কোনো ভাগ্যের ছোঁয়া ছিল না। প্রতিভা আর গোলের জন্য ক্ষুধার্ত থাকার মানসিকতায় গোল এসেছে। এবারের বিশ্বকাপে ৩৯ বছর বয়সি মেসির ধারাবাহিকতা সত্যি অবিশ্বাস্য। অথচ এক সময় আর্জেন্টিনার হয়ে দুঃসহ সময় পার করেছেন মেসি।
আক্ষেপ, আফসোস আর গোল না পাওয়ার হতাশায় ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দেন তিনি। এরপর অবসর ভেঙে ফিরে একের পর এক মহাকাব্য রচনা করেছেন এ ফুটবলার। আর এবারের বিশ্বকাপে অতীতের না পাওয়া সব হিসাব-নিকাশ চুকে নেওয়ার জন্যই যেন খেলছেন মেসি! যেভাবে অতিমানবীয় পারফরম্যান্স শো করছেন এই ফুটবল মহাতারকা, এমনটা অতীতে কেউই দেখাতে পারেননি। মেসি সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবেই শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি, বরং ফুটবল খেলাটাকেই এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছেন। এই জীবন্ত কিংবদন্তি যে ‘অষ্টম আশ্চর্য’ সৃষ্টি করেছেন, সেটি ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করবে বহুকাল।