টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার পানিতে চট্টগ্রামের কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। কয়েক দিনের প্রবল বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন উপজেলার পুকুর, দিঘি ও মাছের ঘেরের বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ মাছ ভেসে গেছে। একই সঙ্গে পানির নিচে তলিয়ে গেছে হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি, বীজতলা ও সবজি ক্ষেত।
প্রাথমিক হিসাবে জেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর, দিঘি ও মৎস্য খামারের মাছ ভেসে গিয়ে ক্ষতি হয়েছে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার। পাশাপাশি ১৫ হাজার ৯১১ দশমিক ১৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে পানি পুরোপুরি না নামায় ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, চূড়ান্ত হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
শনিবার (১১ জুলাই) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের কাজ এখনো চলছে। অনেক এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকায় কৃষিজমি ও মাছের খামারের প্রকৃত ক্ষতি নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। পাশাপাশি দুর্গম এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় সব তথ্য এখনো সংগ্রহ করা যায়নি। পানি নেমে যাওয়ার পর সরেজমিন জরিপ শেষে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।
বন্যায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে চট্টগ্রামের মাছচাষিদের ওপর। বিশেষ করে বাঁশখালী উপজেলায় মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র পাওয়া গেছে। প্রাথমিক হিসাবে সেখানে ২ হাজার ৫০০টি পুকুর, ৩১০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ১ হাজার ৯৭০ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে গেছে। এতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আকস্মিক পানির স্রোতে ঘের ও পুকুরের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় অনেক চাষি মুহূর্তেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বছরের পর বছর ধরে লালন করা মাছ এক নিমেষে ভেসে যাওয়ায় অনেক পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ হয়ে গেছে।
বাঁশখালীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, বন্যার পানির সঙ্গে ভেসে গেছে পুকুরের মাছ, ঘেরের বাঁধ ও চাষিদের স্বপ্ন। যারা ঋণ নিয়ে মাছের খামার করেছিলেন, তারা এখন কীভাবে ক্ষতি কাটিয়ে উঠবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। অনেকের হাতে নেই নতুন করে চাষ শুরু করার মতো অর্থ। ফলে বন্যার পানি নেমে গেলেও তাদের সামনে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যার পানিতে ভেসে যাওয়া মাছ ধরতে বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয়দের ব্যস্ত থাকতেও দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) সাতকানিয়ায় এক যুবকের জালে ধরা পড়ে প্রায় ১২ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ। পরে মাছটি ধরার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একইভাবে বিভিন্ন এলাকায় খাল, বিল ও প্লাবিত জলাশয় থেকে স্থানীয়রা ভেসে যাওয়া মাছ ধরেছেন।
মৎস্য খাতে ক্ষতির দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা। সেখানে ৪৬৬ হেক্টর জলাশয়ের মাছ চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ১০ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এ ছাড়া লোহাগাড়ায় ১ হাজার ৬২০টি পুকুরে প্রায় ৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, কর্ণফুলীতে ৫৫৭টি পুকুরে ৬ কোটি ৮ লাখ টাকা, চন্দনাইশে ৩৮৩টি পুকুরে ৫ কোটি ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, বোয়ালখালীতে ৭৫৬টি পুকুরে ৪ কোটি ৫১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা এবং পটিয়ায় ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুরে ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার টাকার ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া ফটিকছড়িতে ৫৩৩টি পুকুরে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা, হাটহাজারীতে ১৭০টি পুকুরে ১ কোটি ৯৮ লাখ ২৭ হাজার টাকা, আনোয়ারায় ১ হাজার ১০০টি পুকুর ও ১০টি চিংড়ি ঘেরে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, সন্দ্বীপে ৪১২টি পুকুরে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা, মিরসরাইয়ে ৯৭টি পুকুরে ৯৮ লাখ টাকা, রাঙ্গুনিয়ায় ২৭০টি পুকুরে ৯৮ লাখ ৭ হাজার টাকা, রাউজানে ৯০টি পুকুরে ৯৩ লাখ টাকা এবং সীতাকুণ্ডে ১০টি পুকুরে ১৫ লাখ ১৪ হাজার টাকার ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বলেন, ‘এবারের দুর্যোগে চট্টগ্রামের মৎস্য খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপজেলাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি। অনেক এলাকায় এখনো পানি পুরোপুরি না নামায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।’
অন্যদিকে, বন্যার পানিতে কৃষি খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চট্টগ্রাম জেলায় ৩০ হাজার ২২ দশমিক ৫ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে ৯ হাজার ৪৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমি অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২ হাজার ৭২১ দশমিক ৬৭ হেক্টর আমন বীজতলার মধ্যে ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর এবং ১৭ হাজার ৮২৮ দশমিক ৬৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর জমি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
সব মিলিয়ে আউশ ধান, আমন বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি মিলে ১৫ হাজার ৯১১ দশমিক ১৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির নিচে দীর্ঘদিন তলিয়ে থাকায় অনেক ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকদের সামনে এখন নতুন করে চাষাবাদের খরচ জোগাড় করার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে ফসলের ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী উপজেলা। সেখানে ৩ হাজার ৬০৫ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া চন্দনাইশে ২ হাজার ৯৭৩ হেক্টর, ফটিকছড়িতে ১ হাজার ৮৪৪ হেক্টর, সাতকানিয়ায় ১ হাজার ৭৪১ হেক্টর এবং সন্দ্বীপে ১ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানান, অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের কাজ এখনো চলমান। অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বর্তমানে প্রকাশিত হিসাব প্রাথমিক। সব তথ্য সংগ্রহ শেষে ক্ষয়ক্ষতির একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের বন্যা শুধু তাৎক্ষণিক ক্ষতি তৈরি করেনি, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে চট্টগ্রামের গ্রামীণ অর্থনীতিতে। মাছচাষিদের উৎপাদন হারানো, কৃষকের ফসল নষ্ট হওয়া এবং নতুন করে উৎপাদনে ফিরতে বাড়তি অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় হাজারো পরিবার সংকটে পড়তে পারে। পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।