ভূমিগর্ভে লুকিয়ে রাখা ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার দ্রুত উদ্ধার করে ইসরাইলসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের ওপর আগের চেয়েও বেশি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের জন্য ইরান সম্পূর্ণ প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ইরানের এই তৎপরতা মার্কিন বোমাবর্ষণের কৌশলের সীমাবদ্ধতাকেই স্পষ্ট করে তুলেছে বলেও মনে করছেন তারা।
কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল রাস্তাঘাট ধ্বংস এবং সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো ধ্বংসাবশেষে ঢেকে দিয়ে ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর পর্যালোচিত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাকের মতো সাধারণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই ইরান সেই ব্যয়বহুল বিমান অভিযানকে ব্যর্থ করে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা সম্ভব নয়।
যুদ্ধ চলাকালীন ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যেও ইরান সুড়ঙ্গের প্রবেশপথগুলো খননের কাজ চালিয়ে গেছে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল প্রায়ই তাদের খননকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ওপর হামলা চালাত। ফলে যুদ্ধের সময় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের হার অনেক কমে গেলেও তেহরান তা অব্যাহত রাখতে পেরেছিল। সাত সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে এই ঘাঁটিগুলো উদ্ধারে ইরানি তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সিএনএন জানিয়েছে, ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় বন্ধ হওয়া ৬৯টি সুড়ঙ্গপথের ৫০টিই ইতোমধ্যে ইরান সচল করে ফেলেছে।
এছাড়া মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলোর গর্ত মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে এবং দুটি সাইটে রাস্তা নতুন করে পাকাও করা হয়েছে। জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক স্যাম লেয়ার বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী কৌশলগত সাফল্য অর্জনে দক্ষ, যার বড় উদাহরণ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীকে অবরুদ্ধ করে রাখা। তবে এর সাথে যদি একটি বাস্তবসম্মত কৌশলগত যুদ্ধের লক্ষ্য এবং অর্জনযোগ্য বিজয়ের পরিকল্পনা না থাকে, তবে তা শেষ পর্যন্ত কৌশলগত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।’
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল সিএনএন-এর এই অনুসন্ধানের সুনির্দিষ্ট জবাব না দিয়ে কেবল বলেছেন, ‘আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং রাষ্ট্রপতির নির্দেশ অনুযায়ী যেকোনো সময় ও স্থানে তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের রয়েছে।’
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। গত মার্চ মাসে ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ‘ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ও লঞ্চার সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা’কে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিলেন। ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তৈরি ইরানের এই ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলো শত শত মিটার পাথরের নিচে অবস্থিত হওয়ায় মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর জন্য সরাসরি আক্রমণ করা কঠিন ছিল। তাই যুদ্ধের শুরুর দিকে তারা প্রবেশপথ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ধ্বংস করার কৌশল নেয়।
গত ৮ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ দাবি করেছিলেন, ইরানের আর কোনো প্রতিরক্ষা শিল্প অবশিষ্ট নেই।
তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভূগর্ভস্থ সাইটগুলোতে এখনও ইরানের প্রায় ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষিত রয়েছে।
হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি গবেষণা ও নিরাপত্তা নীতি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র গবেষক তিমুর কাদশভ বলেন, ‘তারা ২০ বছর ধরে এই ধরনের যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তারা অত্যন্ত প্রস্তুত।’
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, মে মাসের শুরুতে ইসফাহানের বাইরের একটি ঘাঁটিতে ডাম্প ট্রাক ব্যবহার করে বোমার গর্ত ভরাট করা হচ্ছে, যার দুটি প্রবেশপথ ইতোমধ্যে খুলে দেওয়া হয়েছে। মধ্য এপ্রিলে খোমেইনের একটি ঘাঁটিতে অন্তত ১০টি নির্মাণ যান সুড়ঙ্গ সচল করার কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা গেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান ইতোমধ্যে ড্রোন উৎপাদন পুনঃসূচনা এবং ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার প্রতিস্থাপনসহ তাদের মূল সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন শুরু করেছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, ‘গোয়েন্দা সংস্থার ধারণার চেয়েও অনেক দ্রুত গতিতে ইরানিরা পুনর্গঠনের কাজ শেষ করছে।’
গবেষক তিমুর কাদশভ প্রযুক্তির এই পার্থক্যকে সামরিক অভিযানের বড় জটিলতা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘এই ধরনের ক্ষতি করতে আপনাকে অত্যন্ত পরিশীলিত এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল অস্ত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে, অথচ তা কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়াটি খুবই সাধারণ প্রযুক্তির, যা কেবলই বুলডোজার।’
সূত্র: সিএনএন