দেখতে দেখতে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার এক দশক পূর্ণ হচ্ছে। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে ওই সাংবাদিক দম্পতি নিজ ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। নৃশংস এ ঘটনার পর কেঁপে ওঠে পুরো সাংবাদিক সমাজ। তাদের একমাত্র শিশু সন্তান মেঘের আর্তনাদে চোখের পানি ঝরে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের। সেদিন তারা আশ্বাস পেয়েছিল ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। কিন্তু এখনও সেই মামলার তদন্ত প্রতিবেদনই দাখিল করতে পারেনি র্যাব।
সাগরের মা সালেহা মনির কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘১০ বছর তো হলো। তারপরও কেন মামলার তদন্ত শেষ হচ্ছে না? রুনির মা তো বিচার দেখার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে চলেই গেলেন। আমিও হয়তো এভাবেই চলে যাবো। আমি কি পারবো ছেলের খুনিদের দেখে যেতে। দুনিয়ায় বিচার দেখতে না পেলেও আখিরাতে আল্লাহর কাছে বিচার দেবো।’
সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যায় দায়ের করা মামলাটি তদন্ত করছে র্যাব। এখন পর্যন্ত ৮৫ বার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় নেয়া হয়েছে। কিন্তু তদন্ত শেষ হয়নি। সর্বশেষ গত ২৪ জানুয়ারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ধার্য ছিল। কিন্তু এদিন তদন্ত সংস্থা র্যাব প্রতিবেদন দাখিল করেনি। এজন্য ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তরিকুল ইসলাম প্রতিবেদন দাখিলের নতুন এ তারিখ ঠিক করেন।
সাগরের মা সালেহা মনির বলেন, ‘৮৫ বার পেছালো প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ। এখনো সন্তান হত্যার বিচার পেলাম না। কেন তাদের খুন করা হলো সেটাও জানতে পারলাম না। দিন, মাস, বছর যায় কিন্তু তদন্ত শেষ হয় না। একের পর এক তদন্ত কর্মকর্তা আসেন, আমাদের সাথে যোগাযোগ করেন। এরপর আবার তদন্ত কর্মকর্তা বদলে যায়। কিন্তু মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। কিছুই না, সবই যেন আইওয়াশ।’
সালেহা মনির আরও বলেন, ‘র্যাব পারে না এমন কিছু নেই। অনেক ক্লু-লেস হত্যার রহস্য উদঘাটন করছে। কিন্তু এক্ষেত্রে এত বছর পার হলেও কেন তারা প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে না। এটা একটা লোমহর্ষক মামলা। বিশ্বের আলোচিত মামলা। আমার ছেলেকে যেভাবে নির্যাতন করে মেরেছে, এর চেয়ে যদি ওকে গুলি করে বা অ্যাকসিডেন্ট করিয়ে মেরে ফেলতো; তাহলে ছেলে আমার এত কষ্ট পেতো না। কী দোষ ছিল ওর। এমন নির্মম নির্যাতন করে ওকে মেরে ফেললো। আমার সন্তান গেছে। আমি বুঝতেছি সন্তান হারানোর কষ্ট কত।’
তিনি বলেন, ‘ওদের যে হত্যা করলো, এর কি কোনো আলামত ছিল না? সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হলো ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচার করা হবে। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য ইশারায় প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়লো না। খুনিরা কি সরকারের চেয়েও প্রভাবশালী। আমি বিচার চেয়ে যাবো, আশা ছাড়বো না। মরার আগে খুনিদের দেখে যেতে যায়। তাদের কাছে জানতে চাই, কেন তারা আমার বুক খালি করলো।’
মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের বিষয়ে সালেহা মনির বলেন, ‘এরা কখনো এ ঘটনার সাথে জড়িত না। আমার আত্মা বের করে নিলেও বিশ্বাস করবো না যে এরা হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এটা নিয়েও তো অনেক নাটক হয়েছে। র্যাব হয়তো তদন্ত শেষ করুক, না হয় তাদের ছেড়ে দিক।’
মামলার বাদী নিহত রুনির ছোট ভাই নওশের আলম রোমান বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের তো ১০ বছর হয়ে গেল। বিচার তো দূরের কথা কী কারণে, কারা খুন করেছে তাও জানতে পারলাম না। তদন্তই শেষ হচ্ছে না। সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিষয়টা নিয়ে তৎপর না। মামলা অনেকটা ধামাচাপা পড়ে গেছে। স্বজন হারিয়েছি, আমরা তো বিচার চেয়েই যাবো। আমরা চাই মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হয়ে প্রকৃত অপরাধীরা বের হয়ে আসুক।’
কিছুদিন আগে মারা যান রুনি-রোমানের মা। এ বিষয়ে নওশের আলম বলেন, ‘মায়ের আশা ছিল সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার দেখার। তা তো আর পারলেন না। এই কষ্টে মা অসুস্থ হয়ে যান। পরে তো আমাদের ছেড়ে চলেই গেলেন।’
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক গোলাম মোস্তফা সারোয়ার ওরফে সাগর সারোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন নাহার রুনা ওরফে মেহেরুন রুনি দম্পতি। ঘটনার পরের দিন রুনির ভাই নওশের আলম রোমান রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন। মামলাটি তদন্তাধীন। মামলায় রুনির বন্ধু তানভীর রহমানসহ মোট আট জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার অপর আসামিরা হলেন- বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির, রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু ওরফে মাসুম মিন্টু, কামরুল হাসান অরুন, পলাশ রুদ্র পাল ও আবু সাঈদ। এদের মধ্যে তানভীর ও পলাশ রুদ্র জামিন আছেন। অপর আসামিরা কারাগারে আছেন।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, দীর্ঘদিনেও মামলার তদন্ত শেষ হচ্ছে না। আসামিদের তো আদালতে হাজির দিতেই হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে, তারা অপরাধী হলে সাজা পেতো। আর অপরাধী না হলে ছাড়া পেতো। আমরা আশা করি, আলোচিত এ মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ হবে।
সূত্র : রাইজিংবিডি