ইট-পাথরের জঞ্জালের এই শহরেই লাল-নীল ছোট্ট সংসার পেতেছিলেন মিজানুর রহমান। বড় ছেলে স্কুলপড়ুয়া। আর ছোট ছেলে সবেমাত্র ভাঙা ভাঙা শব্দে ‘বাবা’ বলতে শিখেছে। মিজানুরের দুই চোখে স্বপ্ন- ছেলেরা বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে।
বুড়ো বয়সে বাবা-মায়ের হাত ধরে পথ দেখাবে। মিজানুরের এসব রঙিন স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে, মুহূর্তেই যেন সব হয়ে গেল ধূসর।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় একটি ট্রেনে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এতে চারজন নিহত হন।
তাঁদের মধ্যে মিজানুরের স্ত্রী নাদিরা আক্তার (৩২) ও ইয়াছিন রহমানও (৩) রয়েছে। নিহত বাকি দুজনের পরিচয়ে এখনো মেলেনি।
ছোট্ট ছেলে আর স্ত্রীকে হারিয়ে দিশাহারা মিজানুর কারো কাছে বিচারও দিতে চাইছেন না। ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে সারি করে রাখা নিহতদের লাশ।
সেখানেই ঝাপসা চোখে দূরে তাকিয়ে মিজানুর বললেন, ‘আমি এখন কী নিয়ে বাঁচব। আমার তো সবই শেষ হয়ে গেল। আমি কারো কাছে বিচার চাইব না।’
মর্গে ছিলেন নিহত নাদিরার ভাই হাবিবুর রহমানও। হাবিবুরকে সঙ্গে নিয়েই নেত্রকোনা থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন নাদিরা ও তাঁর দুই ছেলে।
হাবিবুর তাঁর বড় ভাগ্নেকে ট্রেন থেকে বের করতে পারলেও চোখের সামনে পুড়ে মরা যায় তাঁর বোন ও ছোট ভাগ্নে।
হাবিবুর বলেন, ‘নেত্রকোনার সদর উপজেলার বরুনা গ্রামে আমাদের বাড়ি। তেজগাঁও তেজতুরীবাজার এলাকায় থাকি আমরা। আমার বোন নাদিরার স্বামী মিজানুর কারওয়ান বাজারে হার্ডওয়্যারের ব্যবসা করেন। বড় ভাগ্নে রিয়াদ হাসান ফাহিমের (৮) পরীক্ষা শেষ হওয়ায় বেড়ানোর জন্য গত ৩ ডিসেম্বর তাঁরা গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলেন। গতকাল রাত ১২টার দিকে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে চড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ভোরে বোন নাদিরা ও তাঁর দুই ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা ছিল।’
হাবিবুর জানান, তেজগাঁও স্টেশনে পৌঁছার পর ট্রেনের পেছনের সিটে আগুন দেখতে পান তিনি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো বগিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে তিনি দৌড়ে ফাহিমকে নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে গেলেও নামতে পারেনি ভাগ্নে ইয়াছিন ও বোন নাদিরা। তাদের আর কোনোভাবেই বের করতে পারেননি তিনি। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে তাদের মরদেহ বের করেন।
গতকাল সোমবার রাতে স্ত্রী নাদিরার সঙ্গে কথা হয়েছিল মিজানুরের। মিজানুর বলেন, ‘রাতে মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসে ওঠার পর নাদিরার সঙ্গে কথা হয়েছিল। আজ ভোর ৫টার দিকে নাদিরার ভাই হাবিবুর ফোন করে আগুন লাগার খবর দেন। বাসা থেকে দ্রুত তেজগাঁও রেলস্টেশনে পৌঁছি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যখন চারটি লাশ নামান, দেখি আমার স্ত্রী-সন্তান পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে।’
ট্রেনে আগুন লাগার ঘটনায় আহত হয়েছেন নুরুল হক আবদুল কাদের নামের এক ব্যক্তি। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। তিনি যে বগিতে ছিলেন, সেই বগিতেই আগুনের সূত্রপাত হয় বলে তিনি জানান।
কাদের বলেন, ‘বিমানবন্দর স্টেশন পার হয়ে বনানীর কাছাকাছি আসার পর ওই বগিতে আগুন লাগে। তখন রেলের নিরাপত্তাকর্মীদের পোশাক পরা কয়েকজন অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পরই অন্য বগিতে আগুন লেগে যায়। ১০ সেকেন্ডের ভেতরে চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তখন ট্রেন অনেক গতিতে চলছিল। দরজা খুলে গেটের কাছে দাঁড়াই। তখনো ধোঁয়ার কারণে নিঃশ্বাস নিতে পারিনি। পরে ট্রেন থেকে লাফ দিই।’
তেজগাঁও বিভাগ ও রেলওয়ে পুলিশের কর্মকর্তাদের ধারণা, দুর্বৃত্তরা যাত্রীবেশে ট্রেনে উঠে আগুন দিয়েছে। অগ্নিসংযোগকারীরা হয়তো আগুন দিয়ে বিমানবন্দর স্টেশনেই নেমে গেছে। ওই এলাকার ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে।