শুধু ওষুধ প্রমোশনে কম্পানিগুলো বছরে শতকোটি টাকা খরচ করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান।
শনিবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ-২০২৫’-এ তিনি এ কথা বলেন।
ডা. মো. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন কম্পানির অডিট রিপোর্ট দেখেছি। প্রমোশন এক্সপেন্ডিচার বা প্রচারণা ব্যয় যাদের আছে; তাদের কারো কারো ব্যয় ১০০ কোটি টাকার বেশি।
এখানে রিপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধিদের বেতন রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা; এই যে পাঁচতারকা হোটেলে আমরা আছি, এখানে একটি সেমিনারে কোটি টাকার বেশি খরচ হয়। গালা নাইটে তিন কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। একসঙ্গে ৪০-৬০ জন করে বিদেশ সফরে যান; এসব আমাদের কাছে নথিভুক্ত রয়েছে।
দেশের সরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার জন্য কোনো আইন নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন থেকে সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক এক আইন মেনে চলবে। মূল্য ব্যবস্থাপনায় পার্থক্য হলেও মানে কোনো পার্থক্য হবে না।’
তিনি জানান, বাংলাদেশে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ রয়েছে ১ হাজার ৪০০-এর মতো। এর মধ্যে ৩০০-এর কাছাকাছি ওষুধ দিলে ৮৫ ভাগ রোগের চিকিৎসা করা যায়।
এ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধগুলোর দায়িত্ব রাষ্ট্র নিতে চায়। এখানে ৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ রয়েছে। সরকার এ মুহূর্তে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ করে। বাকিগুলো প্রাইভেট সেক্টর থেকে কিনতে হচ্ছে। সরকার এসব ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে চায়।
চিকিৎসকদের পেছনে ওষুধ কম্পানির ২০ শতাংশ খরচ
‘চিকিৎসাসেবার খরচ আরো কমানো সম্ভব। কিন্তু ওষুধ কম্পানিগুলোকে চিকিৎসকদের জন্য ২০ শতাংশ খরচ করতে হয়। এ ব্যয় স্বাস্থ্যসেবার ওপর প্রভাব ফেলে। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহেরের এমন বক্তব্যের সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত এক চিকিৎসক তীব্র আপত্তি জানান এবং এ বক্তব্য প্রত্যাহার করার অনুলোধ জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো কমিশন নেই না। আপনি হয়তো নেন। আপনারা নেন।’
এ সময় অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ডা. মো. সায়েদুর রহমান চেয়ার ছেড়ে চলে যেতে উদ্যত হন। আয়োজকদের অনুরোধে পরে তিনি আবার মঞ্চে ফিরে আসেন।
পরে ডা. তাহের আরো বলেন, ‘সরকারকে প্রাইভেট সেক্টরের প্রতিবন্ধক না হয়ে সহযোগিতা করতে হবে। হেলথ সার্ভিসকে বিজনেস ওরিয়েন্টেড করতে হবে। বাজেট হতে হবে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী এবং প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ আরো জোরদার করতে হবে।’
অসুস্থ থাকা পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানো জরুরি। উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেককে বিদেশ যেতে হয়। সেখানে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। অথচ বিষয়টা উল্টো হওয়ার কথা ছিল। বাংলাদেশে মানুষ যাতে চিকিৎসা নিতে আসে, সেটা হওয়া উচিত ছিল।’
হাসপাতালগুলোকে সেলফ রেগুলেশনের (স্বনিয়ন্ত্রণের) সুযোগ দিতে হবে
স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন ও সংস্কারে প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে সেলফ রেগুলেশনের (স্বনিয়ন্ত্রণের) সুযোগ দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রাইভেট হাসপাতাল, ফার্মাসিউটিক্যাল খাতগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ডি-রেগুলেটেড করার। অনেকের হয়তো নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ডি-রেগুলেটেড ও স্বাধীনতা দিতে আমরা এগোচ্ছি। বেসরকারি খাতের যে হাসপাতাল, ক্লিনিক আছে, তাদের স্বনিয়ন্ত্রণের সুযোগ করে দিন। এটি সারা দুনিয়ায় আছে। সরকার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে না। শুধু বাংলাদেশে এমনটি হয়। এখান থেকে বের হতে হবে। আমাদেরকে স্বনিয়ন্ত্রণের দিকে যেতে হবে। বাংলাদেশে যেখানে যত বেশি নিয়ন্ত্রণ, সেখানে তত বেশি দুর্নীতি। এ নিয়ন্ত্রণ আনা হয় দুর্নীতির জন্য।’
স্বাস্থ্য খাতে অন্তর্বর্তী সরকার বাজেট বাড়াতে পারেনি। ফলে প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাপকহারে বিঘ্নিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. মো আবু জাফর। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এ খাতে বিভিন্ন সমস্যা বিদ্যমান। এর মধ্যে পলিসিগত দুর্বলতা, বাজেট স্বল্পতা, জনবল ও অবকাঠামোর অভাব রয়েছে বলে অভিমত তার।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে নগরভিত্তিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় সরকারের হাতে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্যখাতে নগরভিত্তিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা কিভাবে স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকে? বিশ্বের কোথায় এমনটা আছে? স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমন একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কিভাবে থাকে, যারা স্বাস্থ্য সম্পর্কে কিছুই বোঝে না!’
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহিনুল আলম, স্কয়ার গ্রুপের পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা তপন চৌধুরী, বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস, ল্যাবএইডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ন্যাশনাল টেলিহেলথ সার্ভিসের সিইও ডা. নিজাম উদ্দীন আহম্মেদ প্রমুখ।