জাপানের দক্ষিণাঞ্চলের কুমামোতো অঞ্চলে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ৭ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে হাজার হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বহু সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ভূমিকম্পের পর একটি শপিংমলে বিস্ফোরণ-ধসে পড়ার ঘটনায় বহু মানুষ আটকা পড়েছেন।
দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, সেখানে আটকে পড়াদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে।
টোকিওতে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র এখনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে আহতের খবর পেয়েছি। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সড়ক ও সেতুর ক্ষতি হয়েছে এবং কয়েকটি ভবন ধসে পড়েছে। সবাইকে নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানাচ্ছি।
এর আগে জাপানের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানায়, প্রায় তিন লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাপানের প্রধানমন্ত্রী জানান, উদ্ধার ও ত্রাণকাজে সহায়তার জন্য ৩ হাজার ৬০০ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।
এদিকে ভূমিকম্পের পরেও দেশটিতে একের পর এক আফটারশক অনুভূত হচ্ছে।
জাপানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে জানিয়েছে, একটি হাসপাতালেই ৫০ জনের বেশি আহত ব্যক্তিকে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পের সময় চলন্ত একটি দ্রুতগতির ট্রেনে থাকা কয়েকজন যাত্রীও আহত হয়েছেন।
দেশটির দমকল বাহিনী জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর অ্যায়ন শপিংমলে একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ভবনটির ভেতরে একাধিক ব্যক্তি আটকা পড়েন।
জাপানের টিবিএস টেলিভিশনের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় “বেশ কয়েকজনের” মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অ্যায়নের এক মুখপাত্র জানান, প্রথম ভূমিকম্পের পরপরই ক্রেতা ও কর্মীদের সরিয়ে নেয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কাজুয়া সুরুনাগা জানান, শপিংমল থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে একটি পানশালায় তিনি ভূমিকম্পে ভেঙে পড়া বাসনপত্র পরিষ্কার করছিলেন। তখনই বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান।
তিনি বলেন, বিস্ফোরণটি ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে উঠে যায়। বাতাসের কারণে সেই ধোঁয়া আমাদের দোকানের দিকে আসে। চারপাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, যেন আগ্নেয়গিরির ছাই ঝরে পড়ছে।
এনএইচকের সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, একাধিক ভবনে আগুন লেগেছে বা সেগুলো আংশিক ধসে পড়েছে। উঁচু মহাসড়কসহ বিভিন্ন প্রধান সড়কে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে।
ভূমিকম্পের কারণে দেশটিতে রেল চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং বিমান চলাচলও স্থগিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া ভূমিকম্পের কারণে বিশ্বের বৃহত্তম চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে কুমামোতোর কারখানা থেকে কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে।
জাপানের সনি ও ফুজিফিল্মও ওই অঞ্চলের কারখানাগুলো থেকে কর্মীদের সরিয়ে নিয়েছে বলে নিক্কেই সংবাদপত্র জানিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল কিউশু দ্বীপের বৃহত্তম শহর কুমামোতো থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে। শহরটির জনসংখ্যা প্রায় সাত লাখ।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি কম্পন অনুভূত হয়েছে, সেখানে আগামী এক সপ্তাহ পর্যন্ত শক্তিশালী আফটারশকের আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ভূমিধসের ঝুঁকিও রয়েছে।
সুনামি সতর্কতা প্রত্যাহার
ভূমিকম্পের পরপরই দেশটিতে সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিউশু ইলেকট্রিক পাওয়ার জানিয়েছে, ভূমিকম্পে ৪৮ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
রেলওয়ে কোম্পানি জেআর কিউশু জানিয়েছে, তাদের দ্রুতগতির শিনকানসেন (বুলেট ট্রেন)-সহ সব ট্রেন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এছাড়া কুমামোতো বিমানবন্দর রানওয়ে বন্ধ করে দিয়েছে, ফলে বিভিন্ন ফ্লাইট বাতিল ও অন্য বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে।
মোবাইল অপারেটর কেডিডিআই এবং ডোকোমো জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও যোগাযোগ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্কেও বিঘ্ন ঘটেছে।
তবে জাপানের পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এলাকার কোনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অস্বাভাবিকতা বা দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে দশ বছর আগে কুমামোতোতে এক বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ২৭৫ জন নিহত এবং ২ হাজার ৭৩৯ জন আহত হয়েছিলেন। ওই ভূমিকম্পে হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে শহরের অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন কুমামোতো দুর্গও ছিল।
মঙ্গলবারের ভূমিকম্পেও দুর্গটির পাথরের প্রাচীরের কিছু অংশ ধসে পড়েছে বলে দুর্গ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।