চলতি বছর জানুয়ারি থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ২৫০টি ঘটনায় ৪৪৮ জন পানিতে ডুবে মারা গেছেন। এদের মধ্যে ৩১৭ জনের (৭০ দশমিক ৭৫ শতাংশ) বয়স ৯ বছরের কম।
মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) গণমাধ্যম ও উন্নয়ন যোগাযোগ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান সমষ্টি আয়োজিত সাংবাদিকদের এক অবহিতকরণ কর্মশালায় এসব তথ্য উঠে আসে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সমষ্টি পরিচালিত এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মৃতদের মধ্যে ১৬৯ জন নারী বা কন্যাশিশু রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুরা পরিবারের অন্য সদস্যদের অগোচরে বাড়ির আশেপাশের পুকুর বা জলাশয়ে চলে যায় এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয় আগস্ট মাসে।
“জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ঠ (এসডিজি) অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৫ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাওরে ২৫ নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। রোগ-বা্লাইয়ের বাইরেও বাংলাদেশে প্রতিবছর বড় সংখ্যক শিশুপানিতে ডুবে মারা যায়। তাই শিশুমৃত্যু নিয়ে এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে প্রতিরোধ যোগ্য এ মৃত্যু কমানো জরুরি। পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও সহযোগিতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে বহু সংখ্যক শিশুকে পানিতে ডুবে মৃত্যু থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
কর্মশালায় জানানো হয়, শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ী বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধকে বৈশ্বিকভাবে এসডিজির অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পানিতে ডুবে মৃত্যুকে অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত করা হয়নি। ফলে অসুস্থতাজনিত কারণে শিশু মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব হলেও পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার প্রতিরোধে কর্মসূচি গ্রহণ না করা হলে সার্বিকভাবে শিশুমৃত্যুর উচ্চহার থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যু সারা বিশ্বে আঘাতজনিত কারণে শিশুমৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর তিন লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ জন ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যান। এদের ২০ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হারে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম। বাংলাদেশে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মোট মৃত্যুর ৪৩ শতাংশের জন্য দায়ী পানিতে ডুবে যাওয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এদের মধ্যে ৩২ জনই চার বছরের কম বয়সী। বছরে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজারে। এছাড়া পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে আরো ১৩ হাজার শিশু স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করে। এক লাখ শিশু পানিতে ডোবার কারণে বিভিন্নভাবে আহত হয়।
কর্মশালায় বলা হয়, পানিতে ডুবে মৃত্যুর সবগুলো ‘ঘটনার তথ্য গণমাধ্যম পায় না। এ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় ভাবে কোনো কার্যকর তথ্য সংগ্রহ ব্যবস্থা এখনো গড়ে উঠেনি। আবার গণমাধ্যম প্রতিবেদনগুলো শুধুমাত্র ঘটনাকেন্দ্রিক। এ নিয়ে গভীরতাধর্মী প্রতিবেদনের অভাব রয়েছে। গভীরতাধর্মী প্রতিবেদনে গণমাধ্যমগুলো গুরুত্ব দিলে বিষয়টি নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের গুরুত্ব পাবে এবং এ নিয়ে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়টিকে তরান্বিত করবে।
কর্মশালায় বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) পরিচালক ড. আমিনুর রহমান জানান, এত শিশুর মৃত্যু সত্ত্বেও বিষয়টি পরিকল্পনা ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে অগ্রাধিকার তালিকায় জায়গা করে নিতে পারেনি। ফলে এ নিয়ে সরকারি পর্যায়ে বা জাতীয়ভাবে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। তিনি জানান, সিআইপিআরবি ২০০৫ সাল থেকে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে কার্যকর স্থানীয় ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করে আসছে।
এতে দেখা গেছে, দারিদ্র্য, অসচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের অভাবের কারণে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে শিশুরা পানিতে ডুবছে বাড়ির ২০ গজের মধ্যে এবং মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটছে মূলত সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে। এসময়ে মা-বাবা, বড় ভাই-বোন বা পরিচর্যাকারীরা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকেন। এছাড়াও উদ্বেগের বিষয় হলো বাড়ির আশেপাশের ডোবা-নালা-পুকুর- খাল-বিল সবকিছু উন্মুক্ত। শিশুরা অন্যদের অলক্ষ্যে অবাধে জলাশয়ে চলে যায় এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়।
সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাতে তিনি বলেন, দিনের প্রথমভাগে শিশুদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা হলে বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার ৭০ শতাংশ রোধ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে গ্রামভিত্তিক শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র সফলভাবে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধ কার্যকর। পাশাপাশি এ গ্রামভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্যও সহায়ক। এ ধরনের দিবাযত্নের ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতো অন্যান্য নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার দূরীকরণে বিশেষ অবদান রাখতে পারে।
সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত এ কর্মশালার বিভিন্ন অধিবেশ পরিচালনা করেন সমষ্টি’র পরিচালক ও চ্যানেল আইয়ের জ্যেষ্ঠ বার্তা সম্পাদক মীর মাসরুর জামান, গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি লিড রুহুল কুদুস প্রমুখ।
লাইটনিউজ