শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন

নতুন ওয়ার্ডগুলোর খাল, পুরাতনের নর্দমা মশার প্রজনন কেন্দ্র

লাইটনিউজ রিপোর্ট:
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২০

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। শীতের মৌসুমে এডিস মশার কামড়ে প্রতিনিয়ত মানুষ জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এডিস ও কিউলেক্স মশা নিধনে ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ খুববেশি দেখতে পারছেন না বলে অভিযোগ তুলছেন নগরের বাসিন্দারা। তবে সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিল দাবি করছেন, নিয়মিত মশার ঔষুধ ছিটানো হচ্ছে। তবে নতুন ওয়ার্ডগুলোর খাল এবং পুরাতন ওয়ার্ডগুলোর নর্দমা হচ্ছে মশার প্রজনন কেন্দ্র।

ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের পুরনো ওয়ার্ডগুলোর চেয়ে নতুন ওয়ার্ডগুলোয় মশার উপদ্রব বেশি দেখা গেছে। এছাড়াও সরেজমিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢমেক) গিয়ে দেখা গেছে, ডেঙ্গু রোগে সোমবার নতুন করে আরও ৪ জন ভর্তি হয়েছেন। এখন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গুরোগী ভর্তি আছেন ১৫ জন। প্রতিদিন কমবেশি ৩ থেকে ৪ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। অনেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন। ঢামেকে ১৫ জন ডেঙ্গুরোগীর মধ্যে ৭ জনই ঢাকার বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। বাকি ৮ জন ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুমের তথ্য অনুযায়ী, শীতের মধ্যে ডেঙ্গুরোগীর সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি হতে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ১শ’ ৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অর্থ্যাৎ গত ১০ মাসে ৫৮৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন আর চলতি মাসেই (সেপ্টেম্বর) ৫৮৭ জন ডেঙ্গুরোগে হাসপাতালে ভর্তি হন।

অন্যান্য মাসগুলোর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৯৯ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪৫, মার্চে ২৭, এপ্রিলে ২৫, মে-তে ১০, জুনে ২০, জুলাইয়ে ২৩, আগস্টে ৬৮, সেপ্টেম্বরে ৪৭ এবং অক্টোবরে ১৬৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। তবে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ইতোমধ্যেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক হাজার ৭৭ জন। মোট ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে আগস্টে একজন ও অক্টোবরে দুজনের মৃত্যু হয়।

গতকাল সোমবার (৩০ ডিসেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম ও স্বাস্থ্য তথ্য ইউনিটের (এমআইএস) সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ কামরুল কিবরিয়া স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরও ১৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হন ১৭ জন ও বিভাগীয় হাসপাতালে একজন।

বর্তমানে ৯০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে রাজধানীর ঢাকায় ৭৬ জন ও ঢাকার বাইরে ১৪ জন ভর্তি রয়েছেন। বাকিরা চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে পাঁচ দিন ধরে ঢামেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তিনি আরটিভি নিউজকে বলেন, মিরপুর এলাকায় মশার উৎপাত বেড়েছে। মশা নিধনকর্মীরা কয়েক দিন পর পর দায় সারাভাবে ওষুধ ছিটিয়ে চলে যান। মশার ওষুধ ছিটালেও ঠিকমত মশা মরে না। তাকে কিভাবে এডিস মশা কামড়িয়েছে সেই সম্পর্কে কিছুই বলতে পারেন না। মোস্তফিজুর রহমান বলেন, নভেম্বরের শুরুতে শরীরে জ্বর জ্বর ভাব দেখা দেয়। পরে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে জ্বরের ওষুধ কিনে খাই। ওষুধ খেয়ে দুই একদিন শরীরে জ্বর থাকে না। কিন্তু কয়েক দিন পর ফের শরীরে জ্বর শুরু হয়। পরবর্তীতে নমুনা পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু জ্বর ধরা পড়ে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) নতুন যোগ হওয়ায় মাতুয়াইল এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নতুন ওয়ার্ডগুলোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। মশক নিধনকর্মীদের এই এলাকায় তেমন দেখা মেলে না। ফলে কিউলেক্স ও এডিস মশার উপদ্রব বাড়ছে। এডিস মশার কামড়ে মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। একই অবস্থা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) যুক্ত হওয়া নতুন ওয়ার্ডগুলোর। উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৩ এর আওতায় ২১ নম্বর বাড্ডা, দক্ষিণ বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, পূর্ব মেরুল বাড্ডা, পশ্চিম মেরুল বাড্ডা এবং গুপিপাড়া বাড্ডা নিয়ে। এসব এলাকার বাসিন্দা একই অভিযোগ তুলেছেন।

মশার উপদ্রব নিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ রতন বলেন, শীতের মৌসুমে মশার উপদ্রব বেড়েছে। তবে গতকাল (রোববার) থেকে ফের মশার উৎপাত কমতে শুরু করেছে। এছাড়া পরিবেশের কথা চিন্তা করে মশার ওষুধ কম ছিটানো হচ্ছে। বিকেলে ফগার মেশিনে মশার ওষুধ কম ছিটানো হয়। আর সকালের মশার ওষুধ নিয়মিত ছিটাচ্ছে মশক নিধনকর্মী। মশক নিধনকর্মীদের বেতন কাউন্সিলদের স্বাক্ষরে হওয়ায় এখানে ফাঁকি দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই।

নতুন ওয়ার্ডে মশার উপদ্রবের বিষয়ে এই কাউন্সিলর বলেন, নতুন ওয়ার্ডগুলোর আয়তন বিশাল। এসব ওয়ার্ডে খালে কচুরিপানা থাকায় মশা প্রজনন বেশি হচ্ছে। আর পুরনো ওয়ার্ডে নর্দমা থেকে মশার প্রজনন বেশি ঘটছে।

দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টরা বলেন, সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় প্রতিনিয়ত মশক নিধনকর্মীরা ওষুধ ছিটাচ্ছেন। তবে গত বছরের মতো এবার কিউলেক্স ও এডিস মশার উপদ্রব কম। ফলে গত বছরের তুলনায় ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে হাসপাতালে মানুষ কম ভর্তি হচ্ছেন। শীতের মৌসুম এলেই মশার উৎপাত কিছুটা বাড়ে সেটি জনগণকে মেনে নিতে হবে। মশা নিধনে এখন প্রত্যেক কাউন্সিলর তৎপর রয়েছেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে কোথায় কোথায় মশার ঔষধ ছিটাতে হবে তা কাউন্সিলররা চিহ্নিত করে মশক নিধনকর্মীদের নির্দেশনা দিচ্ছেন। আর মশক নিধনকর্মীরা সেই অনুযায়ী মশার ওষুধ ছিটাচ্ছেন।

বৃষ্টির মৌসুমে নেই এরপরও কিউলেক্স, এডিস মশার সঙ্গে ডেঙ্গুরোগী বাড়ার বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার বলেন, সিটি করপোরেশনে মশা নিধনে বিজ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালিত করতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে এক এলাকায় মশার ঔষধ ছিটানো হলে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। দুই সিটি করপোরেশনকে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে মশা নিধন কার্যক্রমে নামতে হবে।

লাইট নিউজ

আরো সংবাদ

© All rights reserved © 2020 Lightnewsbd

Developer Design Host BD